ইউক্রেনে রুশ হামলায় আক্রান্ত কিয়েভ, ইউক্রেনের প্রতিরোধ


meherin প্রকাশিত: ৯:৪৭ পূর্বাহ্ণ ২৭ ফেব্রুয়ারি , ২০২২
ইউক্রেনে রুশ হামলায় আক্রান্ত কিয়েভ, ইউক্রেনের প্রতিরোধ

আর্ন্তজাতিক ডেস্ক : রাজধানী কিয়েভসহ ইউক্রেনের শহরগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলা নিক্ষেপ অব্যাহত রেখেছে রাশিয়া। হামলা শুরুর তিন দিনের মাথায় গতকাল শনিবার প্রথমবারের মতো ইউক্রেনের দক্ষিণ–পূর্বাঞ্চলীয় মেলিতোপোল শহর দখলে নেওয়ার দাবি করেছেন রুশ সেনারা। তবে রাজধানীসহ বেশ কয়েকটি শহরে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন ইউক্রেনের সেনারা। আর কিয়েভ আক্রান্ত হলেও তাদের প্রতিহত করা হয়েছে বলে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন।

যুদ্ধ থেকে বাঁচতে ইউক্রেন থেকে লাখ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পাশের দেশগুলোর দিকে ছুটছেন। গতকালও মস্কো, লন্ডন, বার্লিন, টোকিও, সিডনি, ব্রাসেলস, কলকাতাসহ বিশ্বের বিভিন্ন শহরে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনসহ দেশটির সামরিক-বেসামরিক ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ অব্যাহত রেখেছে। তবে রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং বর্তমান নিরাপত্তা কাউন্সিলের উপপ্রধান দিমিত্রি মেদভেদেভ গতকাল বলেছেন, লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত সামরিক অভিযান চলবে। পশ্চিমাদের সঙ্গে রাশিয়ার কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখার প্রয়োজন নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।

পশ্চিমা নেতাদের কয়েক সপ্তাহের হুমকি-ধমকি উপেক্ষা করে গত বৃহস্পতিবার ইউক্রেনে সামরিক অভিযান চালানোর নির্দেশ দেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন। সীমান্তবর্তী পূর্ব ও দক্ষিণ দিক এবং বেলারুশের সীমান্তবর্তী উত্তর দিক থেকে ইউক্রেনে হামলা শুরু করেন রাশিয়ার সেনারা। ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলা নিক্ষেপের পাশাপাশি বিমান থেকে ফেলা হয় বোমা। গতকাল পর্যন্ত ইউক্রেনের আট শতাধিক সামরিক স্থাপনা ধ্বংস করা হয়েছে বলে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। অপর দিকে রাশিয়ার সাড়ে তিন হাজার সেনা নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে ইউক্রেন। তাঁদের মরদেহ রাশিয়ায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য রেডক্রসের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে দেশটি। তবে যুদ্ধে রাশিয়ার কোনো সেনা হতাহতের বিষয়ে এখনো নিশ্চিত করেনি মস্কো। রুশ হামলায় ইউক্রেনের অন্তত ১৯৮ জন নিহত হয়েছেন বলে গতকাল দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। নিহতদের মধ্যে তিনটি শিশুও রয়েছে।

কিয়েভে আতঙ্ক
গত শুক্রবার গভীর রাত থেকে কিয়েভে বিমান হামলা চালায় রুশ বাহিনী। রাতে বিস্ফোরণের পাশাপাশি গোলাগুলির শব্দে নগরীতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। রাতের হামলা-সংঘর্ষে দুই শিশুসহ ৩৫ জন আহত হন বলে মেয়র ভিতালি ক্লিৎসকো জানিয়েছেন। গতকাল এক ভিডিও বার্তায় ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, রাতে তাঁকে ধরে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল রাশিয়া। কিন্তু সেই পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিয়েছেন ইউক্রেনের সেনারা। কিয়েভ ও আশপাশের এলাকার নিয়ন্ত্রণ ইউক্রেন সেনাদের হাতেই রয়েছে। তিনি বলেন, ‘মাতৃভূমি রক্ষার সাহস আমাদের আছে। ইউরোপ রক্ষার সাহসও আমাদের রয়েছে।’

যদিও গতকাল রাশিয়ার পার্লামেন্ট ডুমার স্পিকার ভিয়াচেস্লাভ ভোলোদিন বলেছেন, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট আগের দিনই রাজধানী কিয়েভ ছেড়েছেন। সঙ্গীদের নিয়ে তিনি পোল্যান্ড সীমান্তবর্তী লিভ শহরে গেছেন। তাঁর যেসব ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসছে, সেগুলো আগে ধারণ করা। রাশিয়ার সংবাদমাধ্যম স্পুতনিক এ খবর দিলেও জেলেনস্কির রাজধানী ত্যাগের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো কিছু জানায়নি।
নাগরিকদের সুরক্ষায় কিয়েভে কারফিউর সময়সীমায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। রাত ১০টি থেকে সকাল ৭টার বদলে কারফিউ থাকবে বিকেল পাঁচটা থেকে সকাল আটটা পর্যন্ত। যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, কিয়েভের দিকে এগোতে থাকা রাশিয়ার সেনাবহর গতকাল পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার দূরে ছিল।
প্রতিরোধ

৪ কোটি ৪০ লাখ মানুষের দেশ ইউক্রেন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ১৯৯১ সালে স্বাধীন হয়। দেশটির বর্তমান নেতৃত্ব ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর সদস্য হতে চায়। তাতেই আপত্তি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের। তিনি মনে করেন, এটা হলে রাশিয়ার নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। রুশ প্রেসিডেন্টের এই উদ্বেগকে আমলে নেয়নি পশ্চিমা শক্তিগুলো। তার জের ধরেই এই হামলা হয়েছে।

পশ্চিমা গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন ইউক্রেনের সেনারা। এতটা প্রতিরোধের মুখে পড়তে হবে, তা অভিযানের সময় ভাবেনি রুশ বাহিনী। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় গতকাল মেলিতোপোল শহর দখলের যে দাবি করেছে, সে বিষয়ে ইউক্রেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ইউক্রেনের উত্তরাঞ্চলীয় চেরনিহিভ, দক্ষিণের ওডেসা, উত্তর–পূর্বের খারকিভ এবং পূর্বাঞ্চলীয় সুমি শহরে রুশ সেনাদের সঙ্গে ইউক্রেন বাহিনীর লড়াই চলছে।

গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে জেলেনস্কিকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে তিনি তাতে সাড়া দেননি। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট বলেছেন, ‘এখানে লড়াই চলছে। আমার ফ্লাইট নয়, গোলাবারুদ দরকার।’
যুদ্ধবিরতি ও শান্তি আলোচনার বিষয়ে ক্রেমলিনের চাওয়া অনুযায়ী তাঁরা বৈঠকে বসতে রাজি বলেও গতকাল ইঙ্গিত দেন জেলেনস্কি। গত শুক্রবার মস্কোর পক্ষ থেকে শান্তি আলোচনার জন্য বেলারুশের রাজধানী মিনস্কে প্রতিনিধি পাঠাতে সম্মতি জানানো হয়। অপর দিকে ইউক্রেন নেতৃত্ব পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশে এই বৈঠক চেয়েছিল। তবে গতকাল বিকেলে মস্কোয় এক সংবাদ সম্মেলনে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকোভ আলোচনায় বসার প্রক্রিয়া না এগোনোর জন্য ইউক্রেন নেতৃত্বকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, ‘ইউক্রেনের পক্ষ থেকে সমঝোতার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করায় আজ বিকেলে রাশিয়ার সেনারা আবার অগ্রযাত্রা শুরু করেছে।’

ইউরোপে শরণার্থীর ঢেউ
সিরিয়া যুদ্ধের পর আবার শরণার্থীর ঢল নামছে পশ্চিম ইউরোপে। ইউক্রেনে রুশ হামলা শুরুর পর দেড় লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে দেশটিতে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের প্রতিনিধি ক্যারোলিনা লিন্ডহোম বিলিং জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এটা আসন্ন মানবিক সংকটের শুরু মাত্র। ইউক্রেনের পূর্ব, দক্ষিণ ও উত্তরাঞ্চল থেকে মানুষ মধ্য ও পশ্চিম ইউক্রেনের দিকে ছুটছে।

হামলা শুরুর পর তিন দিনে ইউক্রেনের ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ দেশ ছেড়েছেন বলে ধারণা জাতিসংঘের। পোল্যান্ডের উপস্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পাভেল সেফেরনাকের সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বৃহস্পতিবার থেকে গতকাল সকাল সাতটা পর্যন্ত ইউক্রেন থেকে প্রায় এক লাখ মানুষ তাঁদের সীমান্তে ঢুকেছেন। এ ছাড়া হাঙ্গেরি, রোমানিয়া ও স্লোভাকিয়ায়ও যাচ্ছেন যুদ্ধশরণার্থীরা।