ইউক্রেন যুদ্ধ: নিয়ন্ত্রণ বাড়ছে রুশ বাহিনীর


sujon প্রকাশিত: ৮:২৭ পূর্বাহ্ণ ৫ মার্চ , ২০২২
ইউক্রেন যুদ্ধ: নিয়ন্ত্রণ বাড়ছে রুশ বাহিনীর

রয়টার্স, বিবিসি : ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চল, শহর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় রুশ সেনাদের নিয়ন্ত্রণ ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে। হামলার নবম দিনে গতকাল শুক্রবার দেশটির দক্ষিণ–পূর্বাঞ্চলীয় এনারহোদার শহরের জাপোরঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে রুশ বাহিনী।

ইউরোপে এটাই সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এর আগে ইউক্রেনের চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিলেন রুশ সেনারা।

এর বাইরে ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলের খেরশন ও নোভা কাখোভকা, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় মালিতোপোল এবং পূর্বাঞ্চলীয় বারদিয়ানস্ক শহরের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন রুশ সেনারা। ইউক্রেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর খারকিভ, বন্দরনগরী মারিওপোল এবং উত্তরাঞ্চলের চেরনিহিভ ও সুমি শহর ঘিরে গোলা নিক্ষেপ করছে রুশ বাহিনী।

এই পরিস্থিতিতে গতকাল রাশিয়ার জাতীয় প্রতিরক্ষা কমান্ড সেন্টারের প্রধান মিখাইল মিজিন্তসেভ বলেছেন, ইউক্রেন সরকার এখন আঞ্চলিক ও জেলা প্রশাসনের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। তবে এ বিষয়ে ইউক্রেন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানা যায়নি।

পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

গতকাল সকালে রুশ সেনারা জাপোরঝিয়া পারমাণবিক কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আগে সেখানকার একটি ভবনে আগুন লাগে। এ জন্য রুশ সেনাদের দায়ী করেছে ইউক্রেন।

এ ঘটনায় রাশিয়াকে দায়ী করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন পশ্চিমা নেতারাও। অপর দিকে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, কেন্দ্রের বাইরে একটি প্রশিক্ষণ ভবনে অবস্থান নিয়ে রুশ সেনাদের ওপর হামলা করেন ইউক্রেনের জাতীয়তাবাদীরা। গোলাগুলির একপর্যায়ে সেখানে আগুন ধরিয়ে পালিয়ে যান তাঁরা।

চলমান সংঘাতের মধ্যে ইউক্রেনের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশটিতে যেতে চেয়েছেন আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রধান রাফায়েল গ্রোসি। গতকাল তিনি বলেন, এ বিষয়ে রাশিয়া ও ইউক্রেন-উভয় পক্ষের সঙ্গে কাজ করতে চেরনোবিলে যাবেন। ইউক্রেনের চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ১৯৮৬ সালে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিপর্যয় ঘটেছিল। এরপর থেকে কেন্দ্রটি পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। রুশ বাহিনী গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে হামলা শুরুর পরপরই বেলারুশ সীমান্তবর্তী এই কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল। আইএইএ বলেছে, গতকালের আগুন জাপোরঝিয়া কেন্দ্রের পারমাণবিক চুল্লির কাছে পৌঁছায়নি এবং সেখান থেকে কোনো তেজস্ক্রিয়া ছড়ায়নি।

এদিকে ইউক্রেন নিয়ে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে গতকাল ব্রাসেলসে ন্যাটো ছাড়াও জি–৭ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠক করেছেন। অন্যদিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি মস্কোর ওপর আরও বিধিনিষেধ আরোপ না করার আহ্বান জানিয়েছেন। গতকাল তিনি বলেন, ‘প্রতিবেশীদের বিষয়ে আমাদের কোনো খারাপ মনোভাব নেই। আমি মনে করি, সম্পর্ক কীভাবে স্বাভাবিক করা যায়, পারস্পরিক সহযোগিতা চালিয়ে যাওয়া যায় এবং সম্পর্কোন্নয়ন ঘটানো যায়, তা নিয়ে সবাই চিন্তা করবেন।’

হামলা যেসব জায়গায়

ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ, উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় খারকিভ এবং দক্ষিণ–পূর্বাঞ্চলীয় মারিওপোলে রুশ বাহিনীর গোলা নিক্ষেপ অব্যাহত রয়েছে। উত্তরাঞ্চলীয় চেরনিহিভ শহরে রুশ বাহিনীর গোলা হামলায় অন্তত ৪৭ জন নিহত হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর নগর মিকোলেইভে গতকাল রুশ সেনারা ঢুকলে তাঁদের প্রতিহত করা হয়েছে বলে ইউক্রেন কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে।

গতকাল সকালেও কিয়েভের উপকণ্ঠে কয়েক দফা বিস্ফোরণ ঘটে। উত্তর দিক থেকে রাশিয়ার বিশাল সেনাবহর কিয়েভের দিকে এগোচ্ছে। যুক্তরাজ্যের গোয়ন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বহরটি এখনো কিয়েভ থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে রয়েছে। গাড়ির খুচরা যন্ত্রাংশ, জ্বালানি–সংকটসহ বেশ কিছু কারণে সেটি ধীরগতিতে এগোচ্ছে।

মারিওপোলের ডেপুটি মেয়র সের্গেই ওরলভ ন্যাটোর প্রতি ইউক্রেনে সেনা পাঠানোর অনুরোধ করেছেন। গতকাল তিনি বলেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত ন্যাটো জেগে না উঠবে এবং বুঝবে না যে এটা একটি আঞ্চলিক সংঘাত, ততক্ষণ পর্যন্ত আকাশ থেকে বোমা ফেলে ইউক্রেনের বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা করা থেকে পুতিনকে থামানোর কোনো উপায় নেই।’ মারিওপোলের বাসিন্দারা বলছেন, রুশ সেনারা অনবরত আবাসিক এলাকায় গোলা নিক্ষেপ করছেন। শহরে পানি ও বিদ্যুৎ–সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

ইউক্রেনে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হচ্ছে বলে সতর্ক করে রেডক্রস বলেছে, হতাহতের সংখ্যা কেবলই বাড়ছে। দেশটির হাসপাতালগুলো আহত ব্যক্তিদের সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। এদিকে জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদে রাশিয়ার হামলার নিন্দা এবং যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ তদন্তে কমিশন গঠনের প্রস্তাব পাস হয়েছে।

যুদ্ধ থেকে বাঁচতে ইউক্রেন ছেড়ে যাওয়া মানুষের ঢল অব্যাহত রয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের হিসাবে ইতিমধ্যে ইউক্রেন থেকে ১২ লাখের বেশি মানুষ পাশের দেশগুলোতে আশ্রয় নিয়েছেন।