উড়ে যায় স্বপ্নের পাখিরা


resma প্রকাশিত: ৮:২৬ অপরাহ্ণ ২৯ এপ্রিল , ২০২২
উড়ে যায় স্বপ্নের পাখিরা

মশিউর রহমান: বৃষ্টি হয়েছে সারা রাত। টুপ-টাপ বৃষ্টি। ঝুম বৃষ্টি। নিঝুম বৃষ্টি। এখন শীতকাল, অথচ আষাঢ়ে বৃষ্টি। বৃষ্টিস্নাত শীতের সকাল। প্রকৃতিকে আজ কুয়াসাচ্ছন্ন সকালে কলসিকাঁখে রমণীর হেঁটে যাওয়ার মতো মনে হচ্ছে।শীতকালে বৃষ্টি অনেকে সহ্য করতে পারে না। উপভোগ করতে জানে না। শীতকালের বৃষ্টি আমার খুব ভালো লাগে। শীতকালের বৃষ্টিতে শীত আরও জাঁকিয়ে পড়ে। সেজন্যই মজা। শীতকালে শীত, গ্রীস্মে গরম, বর্ষায় বাদল, শরতে কাশফুল আর সাদা মেঘ, হেমন্তে নতুন ধানের গন্ধ সব মিলিয়ে ষড়ঋতুর দেশ। আমাদের বাংলাদেশ। একান্তই আমাদের। মায়ের মতো আপন।
-পৌষ-মাঘের প্রচণ্ড শীতে লেপের নীচে কী যে মজা তা তোমাকে কিভাবে বোঝাবো? আমি এ পৃথিবীতে যতদিন বেঁচে থাকবো ততদিন দুটো জিনিস ভালোবেসে যাবো। একটা হচ্ছে ক্রিকেট। আর একটা বলবো? নাকি বুঝেছো? এই কৃষ্ণা কিছু বলছো না যে!
-তুমিই তো বলো সব সময়, আমি শুনি। তুমি বলো, শুনবো।
-তবে আমার শীতকালে বৃষ্টি তখন ভালো লাগে না, যখন বৃষ্টির কারণে গুরুত্বপূর্ণ কোনো ক্রিকেট ম্যাচ ভেস্তে যায়।
-এখন কী গল্প বলবে, না বৃষ্টি নিয়ে কাব্য করবে?
-কি বলবো, বৃষ্টি, না ক্রিকেটের গল্প?
-তোমার কাছে ক্রিকেটের গল্প অনেক শুনেছি। ব্রাডম্যান, লয়েড, রিচার্ডস, মিয়াদাদ থেকে লারা, সচীন, ওয়াসিম, ওয়াকার সবই তো তুমি শুনিয়েছো। আর যতদিন বেঁচে আছো ক্রিকেট এবং ক্রিকেটারদের গল্প তোমার শেষ হবে না। এখন বলো গতরাতের বৃষ্টি নিয়ে তুমি এতো উত্তেজিত কেন?
-তাহলে বৃষ্টির গল্প শুনবে? কানে কানে বলবো?
-তোমার শুধু ন্যাকামি। ইনিয়ে বিনিয়ে কথা বলা। ন্যাকামি বাদ দিয়ে বলে যাও। আমি শুনে যাই।
-আচ্ছা শোনো। কাল রাতে বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা আমি ক্রিকেটের প্রতি ওভারের প্রতিটি বলের মতো উপভোগ করেছি। বৃষ্টির রিমঝিম শব্দের মাঝে আমি বিভোর থেকেছি। মাঝে মধ্যেই মনে হয়েছে বৃষ্টির শব্দের ছন্দে যেন তোমার পায়ের শব্দ শুনছি। মনে হয়েছে বৃষ্টির ভেতরে তুমি বহুদূর থেকে আমার কাছে আসছো।
-এই থামো, থামো! রবীন্দ্রনাথের কথা চুরি না করে নিজের মতো করে বলো, তাহলে গল্প শোনার জন্য নিজের ভেতরেও একটা আলাদা আগ্রহ সৃষ্টি করতে পারবো।
-স্যরি, কি করব বল, রবীন্দ্রনাথ আমার জীবনের সাথে যেন ওতোপ্রোত ভাবে মিশে আছে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই ওই লম্বা দাঁড়িঅলা লোকটা চলে আসে। ওই দাঁড়িঅলা লোকটাকে কিছুতেই দূরে সরিয়ে রাখতে পারি না। এবার নিজের মতো করে বলছি, শোনো।
-হ্যাঁ নিজের মতো করেই বলো। রবীন্দ্রনাথকে টেনো না।
-রাতের বৃষ্টি সমস্ত পৃথিবীকে নিস্তব্ধ করে দেয়। পৃথিবী যখন নীরব-নিস্তব্ধ তখন আমি খোলা জানালার পাশে এক ঠাঁই বসে। কি যে ভাল্ লাগছিলো তা তোমাকে বোঝানো যাবে না। হঠাৎ হঠাৎ বাতাসের ঝাপটা আমার সমস্ত শরীর ভিজিয়ে দিচ্ছিল। প্রচণ্ড শীত! তবুও আনন্দ! তুমি যদি তখন জানালার পাশে বসতে, বাতাস তোমাকে এলোমেলো করে দিতো। চুলগুলো মুখের উপর আছড়ে পড়তো। ওড়নাটা বুকের উপর থেকে খসে যেতো। আর তখন যদি আমার কাছে ক্যামেরা থাকতো তাহলে কী হতো ভেবেছো? এই তুমি কী শুনছো?
-হ্যাঁ, বলো, শুনছি।
-মাঝে মাঝে যখন বৃষ্টির ফোঁটা বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল তখন কী ইচ্ছে হচ্ছিল জানো? ইচ্ছে হচ্ছিল বৃষ্টিকে গালাগালি করি। মেঘের চোখে আগুন ধরিয়ে দিই। আকাশ যাতে আর কক্খনো কাঁদতে না পারে। আমাকে পাগল ভাবছো? আমি কিন্তু ঠিক আছি। যখন আমি নিসঙ্গ থাকি তখন তুমি থাকো একেবারে মনের গহীনে। সারাক্ষণ তোমাকে অনুভব করি। মনে মনে তোমার চোখের দিকে নির্ণিমেষ তাকিয়ে থাকি। বৃষ্টি একেবারে থেমে যাচ্ছিল। তখন আমি তোমার উত্তপ্ত অশ্রæজল অনুভব করেছি। তুমি তো আমার মনের জমাট বাঁধা কালোমেঘ।
-কৃষ্ণা তোমার মনে পড়ে, তুমি ক্লাস নাইনে পড়তে, পড়ায় মনোযোগী না হয়ে আমার সাথে দুষ্টুমি করতে। কিন্তু আমি তো তখন তোমার শিক্ষক! নাকি। দায়িত্ববোধ তখন আমার কাছে সবচেয়ে বড়। তাই সহ্য করতে না পেরে তোমাকে একটা আলতো করে চড় মেরেছিলাম। রাগে, ক্ষোভে তিন দিন আর আমার কাছে পড়তে আসোনি, দেখা পর্যন্ত দাওনি। আমার বিরুদ্ধে একগাদা অভিযোগ দাখিল করেছিলে তোমার মায়ের কাছে। কত অনুরোধ করেছি! পড়তে আসোনি! সেদিন কেঁদেকেটে দুচোখ ফুলিয়ে ফেলেছিলে। তোমার সেদিনের কান্না কাল রাতের বৃষ্টির সাথে তুলনা করেছিলাম। জানালায় হাত বাড়িয়ে বৃষ্টিকে আদর করছিলাম। কিন্তু আমার বারবার মনে হচ্ছিল বৃষ্টি নয় তোমাকেই আদর করছি। বৃষ্টি যখন বন্ধ হয়ে গেল, তখন তোমার শীতল উপস্থিতি অনুভব করেছি। সেই থেকে আজ পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলো কোনোদিন তোমার গা ছুঁইনি। তোমাকে কী ছোঁয়া যায়? কক্খনো পুরোপুরি ছোঁয়া কী সম্ভব! শুধু তোমার ছোঁয়া চাওয়া যায়! তুমি শুনছো?

-হ্যাঁ, বলতে থাকো।
-কথা না বললে কী একতরফা গল্প ভালো লাগে?
-এবার বলো, আমি সায় দেবো।
-আর কী বলবো?
-আমি বলে দেবো?
-কৃষ্ণা, দেখো আকাশে এখনও মেঘ জমে আছে। আজ রাতেও ঝমঝম বৃষ্টি নামতে পারে। আজ রাতে থাকবে তুমি, আমার সাথে? আমার পাশে?
-তুমি বেশি আবেগতাড়িত হয়ে পড়ছো। এতো আবেগ শরীরের জন্য ভালো না!
-আচ্ছা কৃষ্ণা, তুমি রাতে কখনও বৃষ্টিতে ভিজেছো?
-হ্যাঁ, তবে শীতের রাতে কখনও ভিজিনি।

-আমার নতুন এক বন্ধু। ওর কথা তো তোমাকে বলিনি। ও কিন্তু বয়সে আমার চেয়ে অনেক বড়। তবুও আমরা একেবারে হৃদয়ের কাছাকাছি মিশে গেছি। মানে রীতিমতো প্রেমে পড়ে গেছি। একদিন না দেখলে বার বার ওর অফিসে ফোন করি। কী যে মজার লোক, তোমাকে একদিন দেখাবো। ও কি বলে জানো, বৃষ্টিতে না ভিজলে বৃষ্টি নাকি খুব কষ্ট পায়! প্রকৃতি ও মানুষকে ভেজানোর জন্যই নাকি বৃষ্টি হয়! শীত হোক আর রাত হোক বৃষ্টিতে ওর ভেজা চায়। এই সেদিনও ওর সাথে অফিস থেকে ভিজতে ভিজতে বাসায় এসেছি। আমাকে জোর করে বৃষ্টিতে ভিজিয়ে তবে ছেড়েছে। পরে দুদিন আর অফিসে যেতে পারিনি। সর্দি, জ্বর, কাশি সব একসাথে এসে সুস্থ শরীরটাকে অ্যাটাক করেছিল।

কৃষ্ণার অন্যমনস্কতা আমার দৃষ্টিকে ফাঁকি দিতে পারছে না। ও এখন উঠবে। অন্য কারো কথা ও আমার মুখ থেকে শুনতে চায় না। ও শুধু আমার কথা শুনতে চায়। আমিও ওকে বাধা দিইনি।সেদিনের মতো উঠে গেছে কৃষ্ণা।আমার কথা বলা শেষ হয়নি। কিন্তু কৃষ্ণা কী জানে না, আমার কর্মকোলাহল দিনের সারাক্ষণ সঙ্গী ওর সুন্দর মুখ। কাছে পাওয়ার স্পষ্ট অনুভব। ও কী অনুভব করে না গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেলে আমি ওকেই অনুভব করি। ওর চুলের গন্ধ খুঁজি। ওকে একদিন না দেখলে মনে হয় যেন আজ কিছু না পাওয়া বুকের ভেতর স্পষ্ট হয়ে আছে। এর কারণ আমি বুঝি। প্রেম। টান। অমোঘ টান। সেই টানে আমি ছুটি। ওর সামনে গেলেই অপ্রস্তুত হয়ে পড়ি। ওর সাথে অভিমানের সুরে কথা বলি। আমার অভিমানের সব কারণ খুঁজেও পাই না। এমনি এমনিই অভিমান। অভিমানের মধ্যে এক ধরনের মজা খুঁজি। কিংবা অন্যরকম কিছু হাতড়ে বেড়ায়।

ভালোবাসার কথা বলা হয় না। ভালোবাসা সম্পূর্ণ ভেতরের। ভালোবাসা অনুভবের। কিন্তু ওর কী সেই অনুভ‚তি নেই? এর চেয়ে স্পষ্ট করে কী ভালোবাসার কথা বলা যায়! যারা লজ্জা, সংকোচ উপেক্ষা করে সরাসরি ভালোবাসার কথা প্রকাশ করে আমার মনে হয় তাদের ভেতরের ভালোবাসার শিকড়টা মরা। ভালোবাসা শব্দটার সাথে যদি একটু লজ্জা, সংকোচ, ভয় না থাকে তাহলে ভালোবাসায় কিসের মজা! কৃষ্ণার কী সে উপলব্ধি, অনুভব আজো হলো না? ভালোবাসা শব্দটার মানে বোঝার মতো বয়স যদি হয়ে থাকে তাহলে ও আমার কাছে স্পষ্ট নয় কেন?

২.
ঈদের ছুটি। ঢাকা শহর ফাঁকা। লঞ্চ থেকে যাত্রী নেমে যাওয়ার সময় লঞ্চটা যেমন একটু একটু করে জেগে ওঠে, তেমনি ঢাকা শহর যেন এতোদিন পর একটু আড়ামোড়া ঝেড়ে উঠলো। এতোদিন অসংখ্য মানুষের ভারে দম বন্ধ হয়ে ছিল। আমিও ঢাকাকে ফাঁকা করে ঈদের ছুটিতে গ্রামে এসেছি। কৃষ্ণা আসতে চেয়েছিল, নিয়ে আসতে পারিনি। ও কতদিন বলেছে গ্রাম দেখবে। নানা অজুহাতে ওকে বুঝিয়ে রাখি। বায়না ধরা মেয়েকে সান্ত্বনা দেয়ার মতো কখনো রূপকথার গল্প, কখনো আইসক্রিম খাওয়ানো এই জাতীয় অজুহাতে ওকে বুঝিয়ে রাখি।

আমার আবার এক দোষ, কিছুদিন ঢাকায় থাকলে হাঁফিয়ে উঠি। বার বার গ্রামে যেতে ইচ্ছে হয়। গ্রামে কিছুদিন থাকতে বেশ ভালো লাগে। কিছুদিন না যেতেই আবার আমার প্রিয় শহর ঢাকার কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে অফিস। মনে পড়ে ৬ নং বাস। মনে পড়ে মতিঝিলের মারলিন হোটেল। মনে পড়ে ক্যাফে ঝিলের চা। মনে পড়ে কফি হাউস। মনে পড়ে সপ্তাহের ছুটির দিন। মনে পড়ে সংসদ লেক। চন্দ্রিমা উদ্যান। মনে পড়ে বেইলি রোডের নাটকপাড়া। মনে পড়ে সাগর পাবলিশার্স। বাধ্য হই ঢাকায় আসতে। কোনো একঘেয়েমি সহ্য হয় না। মুক্ত পাখির মতো পৃথিবীকে নিজের করে পেতে ইচ্ছে করে।
কৃষ্ণার চিঠি। অফিস। ইত্যাদি। চলে আসি ঢাকায়। তারপর আগের মতো একটানা অফিস। কখন সূর্য ওঠে, কখন সূর্য ডোবে বুঝতে পারি না। পূর্ণিমার চাঁদ সে তো রূপকথার চাঁদ দেখা।

গ্রাম থেকে ঢাকায় আসার পর সপ্তাহখানেক কৃষ্ণাদের বাসায় যাইনি। অফিসে ও দু’তিন বার ফোনও করেছে। কাজের খুব চাপ। কমপিউটারের ডিস্কে বাঁধা নির্দিষ্ট মেমোরির মতো জীবনটাকে ৫০০ মেগাবাইটে ফিক্সড করে ফেলেছি। এর বাইরে অন্য কিছু ভাবার অবসর মিলছে না। বাসা-অফিস। অফিস-বাসা। ফিরতে ফিরতে প্রতিদিনই রাত দশটা পার হয়ে যায়। তাছাড়া অনেকদিন পর ওদের বাসায় যেতে মনের ভেতর একটা সংকোচ দানা বেঁধে উঠেছে। পুরোনো পথ, পুরোনো পা, চেনা পরিবেশ, তবুও যেন পা দুটো চলতে চাইছে না। ক্যামন যেন ভয় বুকের ভেতর জায়গা করে নিয়েছে। মনটা বিক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে। বাঁধাধরা ডিউটি জীবনটাকে এলোমেলো করে দিল!

মনের চারপাশের দেয়াল, বাঁধা, সংকোচ, লজ্জ্বা উপেক্ষা করে কৃষ্ণাদের বাসায় আমার অনাহুত আগমন। ভেবেছিলাম কৃষ্ণা আমাকে দেখে চমকে উঠবে। অভিমানে ঠোঁট ফোলাবে। শিশুর মতো বলবে, তুমি আমার কেউ না, তুমি আমাকে না দেখে থাকতে পারো! কিংবা নির্বাক শুধু আমার দিকে চেয়ে থাকবে পলকহীন। কিন্তু না সেদিনের দৃশ্য আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না। ওর হাতে হাত রেখে যে মানুষটা দীর্ঘ প্রশান্তির ছোঁয়া খুঁজছে সে আমারই অতি পরিচিত বন্ধু। সাবের ওর সুন্দর ওষ্ঠোদয়ে…। না ওর কথা ভাবতে পারছি না। ওকে আর স্পষ্ট করে পাঠকসম্মুখে তুলে ধরতে পারছি না। ও যতটুকু ভুল করেছে আমি হয়ত তারও চেয়ে বেশি ভুল দেখেছি।

আমি তো ওকে ভালোবাসি। ভালোবাসা কি কখনও মরে যায়? না ভালোবাসার গতি কখনও পরিবর্তন হয়? ভালোবাসার বিকল্প কিছু থাকলে ওকে স্পষ্ট করতে মন সাই দিতো। সেই দৃশ্য কখন যে মনের এ্যালবামে গেঁথে বসেছে বুঝতে পারিনি। কতদিন চেয়েছি মনের এ্যালবাম থেকে ওই পাতাটা ছিঁড়ে ফেলে দেবো ডাস্টবিনে! কিন্তু পারি না। আরো স্পষ্ট হয়ে আমার মনের চোখে সারাক্ষণ জ্বালা ধরায়।

সেদিনের পর থেকে আর অফিসে যেতে ভালো লাগে না। ছুটি ছাড়াই দু-তিন দিন হলো অফিসে যাচ্ছি না। আমি একদিন না গেলে অফিসে গোল বাঁধে। সে উপলব্ধি আমার স্পষ্ট। তবু শুধু পাথরের মতো নিশ্চল বসে থাকতে ইচ্ছে হচ্ছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারলাম না। মনের কাছে হেরে গেলাম।
ভালোবাসা কী ছোট? ভালোবাসা কী স্বার্থপর? ভালোবাসা কী দায়িত্বজ্ঞানহীন। নিজেই আবার উত্তর খুঁজিÑ না, ভালোবাসা অনেক বড়। ভালোবাসা মানে দায়িত্ববোধের।

আবার মনের ডিস্ক থেকে প্রশ্ন ভেসে আসে, ভালোবাসার কী লাভ-ক্ষতি আছে? ভালোবাসা কী বেহিসাবী? হিসেব করে কী কেউ ভালোবাসে?
আবারও উত্তর খুঁজে পায়, ভালোবাসা মরে যায় না। ভালোবাসার ক্ষিধে নেই। ভালোবাসা সত্যিই বেহিসেবি। ভালোবাসার নিজের একটা গতি আছে। সে ইচ্ছেমতো চলে। কখনো কখনো গতিপথ পরিবর্তন করে।কৃষ্ণা যদি সাবেরের মধ্যে ভালোবাসার বাঁধন ও গভীর আত্মবিশ্বাস খুঁজে পায়, তাহলে আমি অসুখি হবো কেনো? আমার আত্মত্যাগই আমার ভালোবাসার মর্যাদা। যারা ভালোবাসতে জানে তারা অন্যের ভালোবাসার মর্যাদা দিতে জানে।

সাবেরের সাথে অনেকদিন হলো দেখা হয় না। আমি আগের মতো স্বাভাবিক। আগের মতো অফিস করছি। প্রতিদিন। নিয়ম মতো। সকাল হলে জানালার ধারে দু’টো কাক এসে স্মরণ করিয়ে দেয় অফিসের কথা। এখনও ওর অফিসে ফোন করি। কথা হয়। হাসাহাসি। ইয়ার্কি। ঠাট্টা। সবকিছু। ঠিক আগের মতো। কিন্তু সামনাসামনি হতে পারছি না। সাবেরও হয়তো উপলব্ধি করতে পেরেছে দু’জনের মাঝে একটা অস্পষ্ট প্রাচীর এসে দাঁড়িয়েছে।কৃষ্ণা আমাকে যেদিন থেকে ‘তুমি’ সম্বোধন করেছিল সেদিন থেকে আমার মনেপ্রাণে গভীর বিশ্বাস জন্মেছিল ও আমাকে মনেপ্রাণে ভালোবাসে। কিন্তু কখনও ওকে স্পষ্ট হতে দেখিনি। আর আমি যে ওকে এতো ভালোবাসি তাও ওকে কখনো স্পষ্ট করে বলতে পারিনি।

৩.
এক ছুটির দিনে রমনা পার্কে বেড়াতে যাওয়ার কথা মনে পড়ে গেল। রমনা থেকে আমি ও কৃষ্ণা দুজন হাঁটতে হাঁটতে বাসায় আসছি। গল্প করতে করতে আসবো তাই রিক্সা কিংবা ট্যাক্সিতে উঠিনি। দুজন দুজনের হাত ধরে গল্প করতে করতে আসছি। মনের ভেতর ছটফট করছে আমার ইচ্ছেটা প্রকাশ হওয়ার জন্য। একপা-দু’পা হাঁটছি আর ভাবছি ওকে এবার সরাসরি সব বলবো। আমি যে ওকে তিল তিল করে ভালোবেসে মনের ভেতর ভালোবাসার তাজমহল তৈরি করে ফেলেছি, সে কথা ওকে জানাবো। কিন্তু না সে স্পষ্ট বলা আজো হয়নি। আমার মনের কথা মনেই রয়ে গেছে। আজো। এখনো। হাঁটতে হাঁটতে মিন্টো রোড পার হয়ে মগবাজার হয়ে কখন যে সিদ্ধেশ্বরী কৃষ্ণাদের বাসায় চলে এসেছি বুঝতেই পারিনি। অজস্র কথার ভিড়ে মনের সাজানো গোছানো কথাগুলো ওলোট-পালোট হয়ে গেছে। অজস্র চাওয়ার ভিড়ে আমার হৃদয়ের নিভৃতকোণের একান্ত চাওয়া হারিয়ে গেছে। আগে ভাবতাম সংকোচ, লজ্জ্বা এসব শুধু মেয়েদের। এখন আমার ভিতর তার স্পষ্ট শিকড় গজিয়েছে।

কৃষ্ণাকে ভুলে থাকার জন্য সারাক্ষণ নিজেকে কাজের মাঝে ব্যস্ত রাখি। সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করি, রাতে একটু ভালো করে ঘুমানোর আশায়। কিন্তু রাতের নিস্তব্ধতায় কৃষ্ণাকে অনুভব করি। হারিয়ে যাই ওর ভাবনায়। ভাবনার সাগরে হাবুডুবু খাই। ভুলতে পারি না ওকে। ভালোবাসার মানুষকে কী কখনো ভোলা যায়?

৪.
অনেকদিন পর কৃষ্ণার ফোন।
-হ্যালো কে বলছেন প্লিজ!
-আমি কৃষ্ণা।
-ও তুমি! ভালো আছো?
-হ্যাঁ, তুমি ক্যামন আছো?
-যেমন তুমি রেখেছো?
-তোমাকে দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে খু-উ-ব। কতদিন তোমাকে দেখিনি!
-তুমি কী আজো হিসেব করে রাখো?
-ভালোবাসার কী হিসেব রাখা যায়? ভালোবাসা বেহিসাবী। তোমারই কথা। তুমি কখন আসছো?
-তুমি ঠিক আছো তো?
-আমার কথার উত্তর দাও।
-আমারও তোমাকে দেখতে ভীষণ ইচ্ছে হচ্ছে। কিন্তু ভয়…!
-কীসের ভয়!
-আমি বুঝি না। তুমিও কী বোঝো না?
-আমি কিচ্ছু বুঝতে চাই না। আমি শুধু তোমাকে দেখতে চায়। কখন আসবে তাই বলো।
-তুমি কী পাগল হলে!
-তুমি কখন আসছো সেটা বলো? তোমার মুখ থেকে অন্য কিছু শুনতে ইচ্ছে করছে না।
-আচ্ছা আসবো, এখন রাখি, হাতে অনেক কাজ!
ইচ্ছে স্বত্ত¡ও কৃষ্ণাদের বাসায় যেতে মন সাই দেয় না। ওদের বাসায় যাওয়ার কথা ভাবলেই একটা দেয়াল এসে বাঁধা দেয়। মাত্র এক মাসের ব্যবধান। সবকিছু ঠিকমতো চলছে অথচ আমার পৃথিবীটা ওলোট-পালোট হয়ে গেছে। সাজানো পৃথিবীর সবকিছু ক্যামন অগোছালো হয়ে গেছে। অচেনা হয়ে গেছে। চিরচেনা গলিটাও আজ খুঁজে পাই না। পা দুটো কিছুতেই ওই গলিতে ঢুকতে চাইছে না। চোখ দুটোও বিদ্রোহ ঘোষণা করছে। গলির মুখে চোখ রাখতেই চাইছে না। পা দুটো একটু একটু কাঁপছে। চোখ দুটো কিছুতেই পা দুটোকে চলতে সাহায্য করছে না। মনটাও ইচ্ছের বিরুদ্ধে চলছে। মনের মাঝে অসংকোচ দানা বেঁধে উঠেছে। মনটা বারবার সতর্ক করে দিয়ে বলছে, ও পথে যেও না। ও পথে আজ কাঁটা বিছানো। এই আমি তা স্পষ্ট অনুভবও করছি। তবুও কৃষ্ণাদের বাসায় আমার হঠাৎ উপস্থিতি। সবকিছু আগের মতো। শুধু আমিই পাল্টে গেছি।
-তুমি এতোদিন আসোনি কেনো?
-আমি না আসলেও তুমি তো ঠিক আছো, নাকি?
-হেঁয়ালি ছেড়ে বলো, কী হয়েছে তোমার?
-কিছু হয়নি। হলেও ঠিক বুঝিনি। বলেও বোঝাতে পারব না।
-কৃষ্ণা, তুমি ভালো থাকো, সুন্দর থাকো এটাই আমার সারাজীবনের প্রত্যাশা। এই অসামান্য চাওয়ার মাঝে আমার সব চাওয়াকে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি।
-আমি ভালো থাকি, সুন্দর থাকি এটাই তোমার সারাজীবনের চাওয়া? আগে বলোনি কেন?
-বললেও কি বুঝতে?
-তবুও তুমি স্পষ্ট হলে না কেন?
-জানি না। থাক ওসব কথা। তোমার কথা বলো।
-আমার কথা সব তো তুমি সাবেরের কাছ থেকে শুনেছো।
-হ্যাঁ, সাবের সব বলেছে। সাবেরের সাথে আমিই তোমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলাম। সেই সাবেরের সাথেই তোমার বিয়ে! অন্তত সেজন্য একটা ধন্যবাদ তো আমি পেতে পারি! তোমার দেওয়া একটা মাত্র ধন্যবাদ। সাবেরের সাথে তোমার বিয়ে, আমাকে জানাওনি। সাবের জানিয়েছে। খুশি হয়েছি। বিয়েতে অবশ্যই আসবো। তোমার বাসর সাজাবো। কী, খুশি হওনি! তোমরা দুজনেই তো আমার বন্ধু। বন্ধু, শত্রæ হলেও বন্ধু।
-কিন্তু যে বন্ধু নয় সে কী কখনো শত্রæ হতে পারে?
-ভালোবাসার এপিট-ওপিট দুটোই তো দেখলাম। ভালোবাসা থেকে শুধু ভালোবাসারই গন্ধ ঝরে।
-সত্যিকার ভালোবাসা তো নিঃস্বার্থ। নিঃস্কাম। নিরপরাধ।

আর কিছু বলতে পারিনি। কৃষ্ণাদের বাসা থেকে বেরিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো হাঁটছি আর ভাবছিÑকী আছে, কিছুই নেই। আমি শুধু আমি। আমার পরিচয় আমি নিজেই। আমার জগতে সবকিছু অস্পষ্টই থেকে যাক। আমার যত কিছু ভাবনা সবই অস্পষ্ট থাক। অস্পষ্ট আমার জীবন চলা। অস্পষ্ট আমার কথা বলা। অস্পষ্ট আমার সকল চাওয়া-পাওয়া। অস্পষ্টের বেড়াজালে আমি হারিয়ে যাচ্ছি। মিলিয়ে যাচ্ছি। প্রতিনিয়ত। প্রতিক্ষণ। আমার স্মৃতিগুলো সব রং বদলিয়ে ফিকে হয়ে যাবে। স্বপ্নগুলো দুমড়ে মুচড়ে বুকের মাঝে দলা পাকিয়ে পড়ে থাকবে। একদিন কৃষ্ণা আমার জীবনে এসেছিল বৈশাখের সোনারং নিয়ে, আজ থেকে সে আমার স্মৃতিতে ফিকে হয়ে যাবে! আমার স্বপ্ন ও স্বপ্নের পাখিরা এভাবেই ডানা মেলে উড়ে যাবে। সে স্মৃতি, সে স্বপ্ন, ভালোবাসার আঁচড়মোচড় মনে রেখেই বা কী লাভ!

মশিউর রহমান-শিশুসাহিত্যে ইউনিসেফ মীনা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড (২০১৬) এবং অগ্রণী ব্যাংক-শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত। প্রকাশক, সৃজনী, অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি।