এই আধুনিক সময়ে কীভাবে খাবারের পুষ্টি ফিরিয়ে আনবেন?


rupali প্রকাশিত: ৬:২৩ অপরাহ্ণ ২৩ ফেব্রুয়ারি , ২০২২
এই আধুনিক সময়ে কীভাবে খাবারের পুষ্টি ফিরিয়ে আনবেন?

ফিচার ডেস্ক : দেখতে এবং খেতে গাজরের মতো হলেও আমরা কি আদৌ ‘গাজর’ খাচ্ছি? বা এটি কি এখনও আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য আগের মতোই ভালো?
বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যাসপারাগাস থেকে পালং শাক পর্যন্ত কিছু সাধারণ সবজির পুষ্টিমান ১৯৫০ সাল থেকে উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। ২০০৪ সালের মার্কিন গবেষণায় দেখা গেছে , ২০ শতকের মাঝামাঝি সময়ের তুলনায় কিছু বাগানের ফসলের পুষ্টিগুণ প্রায় ৩৮ শতাংশ কম।

গবেষণায় ৪৩টি সবজি পরীক্ষা করে দেখা গেছে, সেগুলোতে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ ১৬ শতাংশ, আয়রন ১৫ শতাংশ এবং ফসফরাস ৯ শতাংশ কমেছে। ভিটামিন রিবোফ্লাভিন এবং অ্যাসকরবিক অ্যাসিড দুটোই উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে; সেইসাথে কমেছে প্রোটিনের মাত্রাও। এমনকি গমে উপস্থিত খাদ্য উপাদানের মাত্রাও অনুরূপহারে কমেছে। এর কারণ কী?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর খাদ্যের ঘাটতির কারণে বিজ্ঞানীরা খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে কৃত্রিম সার, কীটনাশক ও হার্বিসাইড ব্যবহারের পাশাপাশি নতুন উচ্চ-ফলনশীল শস্য ও গবাদি পশুর জাত উদ্ভাবন করেন। সেচের উন্নতি এবং সাশ্রয়ী মূল্যের ট্রাক্টরের আবির্ভাবের সাথে ফসলের উৎপাদনশীলতা বাড়তে থাকে বহুগুণ।

১৯৬১ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে গড় বৈশ্বিক খাদ্যশস্যের ফলন বেড়েছে ১৭৫ শতাংশ। উল্লেখ্য, এই সময়ের মধ্যে গমের উৎপাদন হেক্টর প্রতি ১.১ টন থেকে বেড়ে হয়েছে ৩.৪ টন।

কিন্তু ফলন বেড়ে যাওয়ার সাথেসাথে কিছু ফসলের পুষ্টির মান কমেছে। অনেকের মতে, কৃত্রিম কীটনাশক, সার এবং অন্যান্য রাসায়নিক ব্যবহার মাটির স্বাভাবিক ভারসাম্য ও ফসলের পুষ্টিমানকে প্রভাবিত করেছে।

তবে, যুক্তরাজ্যে বিভিন্ন চাষাবাদের কৌশল ব্যবহার করে উৎপাদিত গমের উপর ১৭০ বছর ধরে চালানো ব্রডবাল্ক গবেষণা থেকে দেখা গেছে, পুষ্টিমান কমার পেছনে রয়েছে আরও কিছু কারণ।

“ব্রডবাল্ক পরীক্ষাটি বিশ্বের প্রাচীনতম চলমান গবেষণাগুলোর মধ্যে একটি। ১৮৪৩ সালে শুরু হওয়া গবেষণাটি শীতকালীন গমের উপর অজৈব বা কৃত্রিম সার এবং জৈব সারের প্রভাবের তুলনা করছে। বিশেষভাবে আয়রন এবং জিঙ্কের মাত্রা পরীক্ষা করা হয় এই গবেষণায়,” বলেন যুক্তরাজ্যের রোথামস্টেড রিসার্চের মৃত্তিকা ও উদ্ভিদ বিজ্ঞানের অধ্যাপক স্টিভ ম্যাকগ্র্যাথ।

“আমাদের অনুসন্ধানে দেখা যায়, চাষের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসলেও মাটিতে অবস্থিত মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট কমে যায় না,” বলেন তিনি।

তাহলে চাষযোগ্য মাটিতে সমস্যা না থাকলে পুষ্টিমান কমার কারণ কী?

১৯৫০-এর দশকে, মেক্সিকোতে কর্মরত নরম্যান বোরলাগ নামে একজন আমেরিকান বিজ্ঞানী রোগ প্রতিরোধী-গমের একটি ছোট আকারের জাত তৈরি করেছিলেন। ফসলটির উচ্চতা ২০ শতাংশ কমানোর ফলে সেগুলো ঝরে পড়ার সম্ভাবনাও কমে যায়।

“এই বামন জিন আবিষ্কারের একটি অতিরিক্ত সুবিধা হল, এতে করে উদ্ভিদটি লম্বায় না বাড়ার ফলে বৃদ্ধির জন্য মজুত শক্তি দিয়ে এর ডালপালা বাড়তো। ফলে গমের দানার উৎপাদনও বাড়তে থাকে,” বলেন ম্যাকগ্র্যাথ।

সেসময় উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জনসংখ্যা দ্রুত সম্প্রসারিত হতে থাকায় ফসলের এই উচ্চ উৎপাদনকে স্বাগত জানায় সবাই। কিন্তু, এই উদ্ভাবনের একটি অপ্রত্যাশিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলো, গমের উৎপাদন বাড়লেও পুষ্টির মাত্রা কমতে থাকে।

ম্যাকগ্র্যাথ বলেন, “বামনাকৃতির সেই গম থেকে ময়দা তৈরি পর সেটিতে কার্বোহাইড্রেটের অনুপাত কমে যায়।”

সবুজ বিপ্লব বা ‘গ্রিন রেভলিউশন’ বিশ্বের ক্ষুধা মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও আজ আমাদের সামনে রয়েছে উচ্চ ক্যালরি এবং নিম্ন পুষ্টিমান-সম্পন্ন খাদ্য। ক্যালরি সমৃদ্ধ খাবারকে স্বাস্থ্যকর হিসেবে উল্লেখ করা হলেও আমাদের দেহের জন্য প্রয়োজনীয় অনেক পুষ্টি উপাদানই এসব খাবারে অনুপস্থিত।

এছাড়া, কিছু বিজ্ঞানীর মতে, খাদ্যের পুষ্টিমানের সাথে মাটির গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে।

পেনসিলভেনিয়ার রোডেল ইনস্টিটিউটের মৃত্তিকা বিজ্ঞানী গ্ল্যাডিস জিনাটি বলেন, “ভেজিটেবল সিস্টেমস ট্রায়াল ২০১৬ সালে শুরু হয়। এই গবেষণার মূল লক্ষ্য, চাষের বিভিন্ন পদ্ধতি ও মাটির স্বাস্থ্যের সাথে ফসলের পুষ্টির ঘনত্বের সম্পর্ক পরীক্ষা করা।”

জিনাটির গবেষণা অনুযায়ী, মাটিতে যত বেশি ছত্রাক এবং সক্রিয় জীবাণু থাকে, ফসলে পুষ্টিগুণ থাকার মাত্রাও ততো বাড়ে। ছত্রাক এবং ব্যাকটেরিয়া সমৃদ্ধ মাটি ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানগুলো ভাঙতে সাহায্য করায় তারা মাটি থেকে সেগুলো সহজেই শুষে নিতে পারে।

মাটি মূলত চারটি উপাদান দিয়ে তৈরি: শিলা কণার আকারে খনিজ পদার্থ, জৈব পদার্থ (উদ্ভিদ, ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া এবং মৃত বা জীবিত অণুবীক্ষণিক জীবাণু), বায়ু এবং পানি।

এক চা চামচ পরিমাণ মাটিতে যে পরিমাণ জীবাণু আছে তা পৃথিবীতে বর্তমানে জীবিত মানুষের চেয়েও বেশি। লক্ষাধিক ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির এই জীবাণুগুলোর সাথে মিশে আছে মাইকোরাইজা নামক ছত্রাকের ফিলামেন্টের একটি নেটওয়ার্ক।

এই বিশেষায়িত মাটির ছত্রাকগুলো একটি বিশালাকৃতির জাল তৈরি করে মাটির গভীর থেকে পুষ্টি উপাদান মুক্ত করে এমন আকারে সেগুলোকে ভাঙে যা উদ্ভিদ শোষণ করতে পারে।
মাইকোরাইজা ছত্রাকের এই বিশেষ গুণের কারণে এটি পাউডার হিসেবে বাণিজ্যিকভাবে বিক্রিও হয়।

তবে, শুধুমাত্র উচ্চ অভিযোজিত ছত্রাকই নয়্ যেসব ফসল প্রতিকূল পরিবেশে জীবনধারণে সক্ষম, সেগুলোও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে।

প্রাকৃতিক হোক কিংবা বা মানব প্রভাবিত, চাষের কৌশল হোক কিংবা আবহাওয়া- আমাদের খাদ্যের পুষ্টি উপাদান অনেক কারণ দ্বারাই প্রভাবিত।

স্টিভ ম্যাকগ্র্যাথ বলছিলেন, আমাদের এমন একটি খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা প্রয়োজন যা খাদ্যের পুষ্টির উপর নজর রাখে। সেইসাথে এমন একটি বাণিজ্যিক মডেল তৈরি করতে হবে যা সবার আগে পুষ্টির দিকেই নজর দেয়।

“শুধুমাত্র উচ্চ ফলন নয়, বরং কার্যকরি পুষ্টিগুণ সম্পন্ন ফলনের জন্য কৃষকদের অর্থ প্রদান করা উচিত,” বলেন তিনি।

পুষ্টি এবং কৃষিকাজের মধ্যে যে সংযোগ রয়েছে, তা নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন বলে মনে করেন পুষ্টিবিজ্ঞানীরা। বর্তমানে যেখানে বিশ্বব্যাপী দুই বিলিয়নেরও বেশি মানুষ মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের ঘাটতিতে ভুগছে, সেখানে পুষ্টি নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে ভালো কিছুই আসতে পারে বলে ভাবছেন তারা।

সূত্র:বিবিসি