“একজন হার না মানা নারীর গল্প”


sujon প্রকাশিত: ৪:০৫ অপরাহ্ণ ৮ মার্চ , ২০২২
“একজন হার না মানা নারীর গল্প”

নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে নারীদেরকেই প্রথমে সচেতন হতে হবে নারীর অধিকার সম্পর্কে। একজন নারী প্রথমে নারী নয় একজন মানুষ সেই সত্যের বীজ বপন করা জরুরী। মনে এবং মননে নিজেকে মানুষ মনে করে সত্য এবং ন্যায়ের পথে হাঁটতে পারা মানুষের সংখ্যা বেশি না হলেও একেবারে কমও নয়।

 

নারী হচ্ছে প্রকৃতি, প্রকৃতি যেমন সকল প্রতিকূল পরিবেশে সবাইকে রক্ষা করে আগলে রাখে নারীও তাই। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশে নারীদের যথাযথ মর্যাদা দিতে, তাঁদের কাজের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতেও তাঁদের উপযুক্ত মূল্যায়নের জন্যই প্রতিবছর ৮ই মার্চ বিশ্ব নারী দিবস পালিত হয়ে আসছে। এ দিনটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছিল ১৯৭৫ সালে, জাতিসংঘের কাছ থেকে। এরপর থেকেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকম কার্যক্রমের মাধ্যমে উদযাপন করা হচ্ছে নারী দিবসকে। কোথাও কোথাও এটি উদযাপিত হয় একটি আনন্দ-উৎসব রূপে, নারীদের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শনের জন্য; আবার কোথাও-কোথাও উদযাপন করার মূল কারণ হচ্ছে নারীদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তি নিশ্চিত করা, তাদের ন্যায্য অধিকার দেওয়া। যেভাবেই উদযাপিত করা হোক না কেন এর মূল লক্ষ্যই হলো নারী ও পুরুষের বাহ্যিক ভেদাভেদ দূর করে লিঙ্গ সমতা প্রতিষ্ঠা করা, একটি আদর্শ সমাজ গঠন করা।

নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে নারীদেরকেই প্রথমে সচেতন হতে হবে নারীর অধিকার সম্পর্কে। একজন নারী প্রথমে নারী নয় একজন মানুষ সেই সত্যের বীজ বপন করা জরুরী। মনে এবং মননে নিজেকে মানুষ মনে করে সত্য এবং ন্যায়ের পথে হাঁটতে পারা মানুষের সংখ্যা বেশি না হলেও একেবারে কমও নয়। সেই রকম একজন নারী বেগম রোকেয়া পদক প্রাপ্ত এবং ফাতেমা কুদ্দুস ফাউন্ডেশনের সম্মানিত সভাপতি রত্নগর্ভা মা প্রফেসর জোহরা আনিস।আজ নারী দিবসে শ্রদ্ধার সাথে স্বরণ করছি এই মহিয়সী নারীকে।যিনি তার সমস্ত জীবন কাজ করে গেছেন নারীর জন্য, নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা, নারীর ক্ষমতায়ন, পরিবার,দেশ তথা সমাজের জন্য।

প্রফেসর জোহরা আনিস শুধুই কি একটি নাম? একজন সংগ্রামী, হার না-মানা, ধীরস্থির ভাবে সব বাঁধাবিপত্তি পেরিয়ে সামনে এগিয়ে চলার সাহসী এক প্রত্যয়ের নাম প্রফেসর জোহরা আনিস। তিনি পারিবারিক সীমানা কে অতিক্রম করে সমাজ এবং দেশের সীমারেখাকে স্পর্শ করেছেন তার অসামান্য কাজ দিয়ে।

সৎ ও আদর্শ স্কুল শিক্ষক বাবা এবং অত্যন্ত মেধাবী, বিচক্ষণ একজন মায়ের সন্তান জোহরা আনিস। যিনি বাবা মায়ের ছয় ছেলে মেয়ের মধ্যে সবচেয়ে বড়। কেবল সন্তান হিসেবেই তিনি বড় ছিলেন না তিনি তার কাজ -কর্ম, দায়িত্ববোধ এবং কর্তব্য পালনেও বড়ত্বের সাক্ষর রেখেছেন সব সময়। তিনি সারা জীবন তাঁর বাবা মায়ের আদর্শ কে বুকে লালন করে পথ চলেছেন। বাবা এবং ভাই কে হারিয়ে কেবল মা এবং বোনদের সাথে নিয়ে একটি গ্রামের সহজ সরল মেয়ের পক্ষে নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেও সমাজের পিছিয়ে পরা মানুষদের বিশেষ করে নারীদের জন্য কাজ করা খুব একটা সহজ কথা নয়। নানা কুসংস্কার আর পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গীকে পদদলীত করে সমাজে নারীর জয়গান গাওয়া কোন সহজ গল্প নয় কিন্তু সেই সব কিছুই জোহরা আনিস করেছেন নির্ভিগ্নে এবং নির্ভয়ে। সেই স্বপ্ন সারথী কে নিয়েই আজকের নারী দিবসের উপাখ্যান।

১৯৪৭ সালে ১৫ অক্টোবর ব্রাক্ষ্মনবাড়ীয়া জেলার নবীনগর থানার ছোট্ট গ্রাম গুড়িগ্রামে এক সম্মান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহন করেন জোহরা আনিস।যিনি ছোট বেলা থেকেই প্রচন্ড রকম আত্মবিশ্বাসী একজন মানুষ ছিলেন। সেই আত্মবিশ্বাসের ছাপ তিনি রেখেছেন তার বর্ণ্যাড কর্মজীবন এবং ব্যক্তগত জীবনেও।

তিনি ছিলেন অত্যন্ত সংবেদনশীল একজন মানুষ যিনি সমাজকে নিজের দৃষ্টি দিয়ে দেখেছেন আবার অন্যের যন্ত্রনা উপলব্ধি করে সেই যন্ত্রনার চিত্র মুছে দিতে তার অসামান্য মেধা এবং বুদ্ধী দিয়ে কাজ করে গেছেন।

একটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদের স্থান কে মর্যাদার সাথে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তাঁর চলার পথে সব পর্যায়ে কি ঘরে কি বাহিরে।নির্দিষ্ট সম্প্রদায় থেকে ব্যক্তি জীবনে কিভাবে জায়গা করে নিতে হয় তা সুনিপুণ ভাবে দেখিয়ে গেছেন তাঁর সেবা মূলক কাজের মাধ্যমে।

আমরা জানি নারী -পুরুষের অসম অবস্থান সব সময় সব স্তরেই বিরাজ করেছে এবং করছে। এই সমাজও তার ব্যতিক্রম নয়। তাই এই প্রতিকূল পরিবেশে নারীদের পথচলা এতোটা সহজ ছিল না কোন সময়েই। একজন পুরুষ যেমন কাজ করেন বাহিরে তেমনি একজন নারীর ক্ষেত্রে তা নয়। নারী ঘরে এবং বাহিরে তার চেয়ে অনেক কাজ করলেও সমাজে নারীদের উপরই সকল অশুভ শক্তি ভর করে থাকে। তাই এমন সব অশুভ ছায়া কে পায়ে মাড়িয়ে প্রফেসর জোহরা আনিস এগিয়ে গেছেন দীপ্ত পায়ে। শত বিড়ম্বনা কে তুড়ি দিয়ে হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়েছেন সব সময়।কারন নারীরাও যে পুরুষের মতো অনেক ক্ষেত্রে বেশি কিছু করতে পারে তা প্রমান করতেও জোহরা আনিসকে করতে হয়ছে অনেক সংগ্রাম। তাঁর সমসাময়িক অনেক নারী থাকলেও তিনি যেমন করে দৃঢ় চিত্তে এগিয়ে গেছেন তেমন করে অনেকেই করতে পারেন নি।

অপূর্ব বর্ণিলতার ছটায় সৃষ্টির আনন্দে মোহিত এ এক অপরূপ কর্মময় জীবন প্রফেসর জোহরা আনিসের।যে জীবন কেবল নারী হিসেবে নয় একজন মানবিক মানুষ হিসেবে চিরকাল বেঁচে থাকবেন আমাদের মাঝে। প্রফেসর জোহরা আনিসে শারীরিকভাবে দৃশ্যমানতা হারালেও তাঁর কর্মের মহাযজ্ঞেই তিনি প্রতিনিয়ত আমাদের কাছে প্রতিভাত হবেন।

ভালবাসার লাল চাঁদোয়া অকস্মাৎ সরে গেলে যেমন হতে পারে ,অসংখ্য সমাজসেবা মূলক সংগঠনের নেতা শ্রদ্ধেয়জন গত বছর ২১ শে অক্টোবর ২০২১ প্রফেসর জোহরা আনিসের হঠাৎ বিদায়ে এমনটাই দৃশায়িত হয়েছে।ভালবাসায় মোড়ানো এক শুভ্র হৃদয় প্রফেসর জোহরা আনিস।যে হৃদয় পরিবার, সমাজ তথা দেশকে দু’হাতে দিয়েছিল সফল নারীর এক অমর গল্পগাঁথা। অতি সাধারন জীবন যাপন করেও শিক্ষার আলোয় আলোকিত জীবনের কিছু আলাপন। তাঁর কর্মময় জীবন এবং সেবা মূলক কাজ থেকে দিয়ে হৃদ্ধ হয়েছে পরিবার, সমাজ এবং দেশ। তাই এই মহীয়সী নারীর যেন কোন বিদায় নেই । বাংলার আকাশে তারা হয়ে রবেন সকলের পরম প্রিয় রত্নগর্ভা মা জননী প্রফেসর জোহরা আনিস।

লেখক

ফারজানা ভূঁইয়া, সহ-কোষাধ্যক্ষ ফাতেমা কুদ্দুস ফাউন্ডেশন। সাবেক শিক্ষার্থী শাবিপ্রবি, সিলেট।

মো. শাহিন রেজা, সাবেক শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।