খেয়ে বেঁচে থাকাটায় যেন তাদের পরম সৌভাগ্য


sraboni প্রকাশিত: ৮:৪৮ অপরাহ্ণ ৫ মার্চ , ২০২২
খেয়ে বেঁচে থাকাটায় যেন তাদের পরম সৌভাগ্য

আব্দুর রব ও আসিফ মিয়া: ঢাকার ফুটপাথে হাজারো ছিন্নমূল মানুষে বাস। বিভিন্ন কারনে বিপর্যস্ত হওয়া মানুষগুলো বেঁচে থাকার তাগিদে আশ্রয় খোঁজে ঢাকার ফুটপাথগুলোতে। দিনমজুর কিংবা অন্য কোনো কায়িক শ্রমের কাজে নিয়োজিত হয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রামে নামে তারা। কিন্তু তাদের এই সংগ্রাম দিনে দিনে কঠিন হয়ে যাচ্ছে। নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় তিন বেলা খেয়ে বেঁচে থাকতে পারাটাই যেন তাদের পরম সৌভাগ্য।

যমুনার ভাঙ্গনে সবকিছু হারিয়ে সহায় সম্বলহীন রহিমা বেঁচে থাকার তাগিদে ১০ বছর আগে স্বামীর হাত ধরে ছুটে এসেছিলেন রাজধানী ঢাকায়। প্রথমে মোহাম্মদপুর ঢাকা উদ্যান সংলগ্ন একটি রাস্তায় সাত বছর কাটান। উচ্ছেদ করা হলে তারা চলে আসেন আগারগাঁও এর চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পীছনের সড়কের ধারে। পঙ্গু হওয়ায় বাহিরের কোন কাজ করতে পারেন না রহিমা।

রহিমা বলেন, প্রথমে আমার স্বামী রিকশা চালতো। তখন যা আয় করত তা দিয়ে তিন বেলা ভালোমত খেতে পারতাম। কিন্তু ওনার বয়স হয়ে যাওয়ায় এখন আর রিকশা চালাতে পারে না। এখন ঝালমুড়ি বিক্রি করে। করোনার সময় ঝালমুড়ি বিক্রি সেভাবে হয় না। আয় অনেক কমে গেছে। কিন্তু জিনিসপত্রের দাম অনেক বেড়ে গেছে। দুই বছর আগেও আমরা শাক-সবজি কিনে খেতে পারতাম। কিন্তু এখন চাল কিনতেই সব টাকা ফুরিয়ে যাচ্ছে। আগে যে চাল কিনতাম ৩৫ টাকা দিয়ে, সেই চাল এখন ৫০ টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে। আমাদেরকে সরকার থেকেও কোন সহযোগিতা দেওয়া হয় না। ছেলে মেয়েদের মাছ-মাংস খাওয়াতে পারি না। রাস্তায় প্লাস্টিকের জিনিস কুড়িয়ে ছেলেরা কিছু টাকা আয় করে।

কল্পনা বেগমের পরিবারের আয় কমেছে অন্যদিকে দিনকে দিন বাড়ছে খরচ। চাল, ডাল, তেলসহ সব কিছুই তাদের নাগালের বাইরে। তাই এখন দু’বেলা মোটা চালের ভাতের সঙ্গে আলু সিদ্ধ দিয়ে খেয়েই জীবন চলে তাদের। জীবনের এই করুণ বাস্তবতার চিত্র শুধু কল্পনার পরিবারের নয়, খিলগাঁও রেললাইন আর মালিবাগ ফুটপাতের পাশে ঘরে উঠে অসংখ্য ভাসমান পরিবাবের অবস্থা একই রকম।

খিলগাঁও রেললাইনের পাশে ইট ভাঙছেন সালেহা বেগম (৫৫)। সারাদিন কাজ করে মাত্র একশ থেকে দেড়শ টাকা আয় করেন। তিনি বলেন, আমাগো ঘর ভাড়া দিয়া থাকার সামর্থ্য নাই। সারাদিন ইট ভাঙি, রাইতে এহানেই ইট হিতান দিয়া ঘুমাই। এটাই আমাগো কষ্টের জীবন। কোন রকম আলু সিদ্ধ দিয়া ভাত খাই। আগে তরি-তরকারি কিনতে পারতাম। এহন তাও কপালে জোটে না। এত দাম দিয়া তরকারি কিনতে পারি না। আমাগো দেখার কেউ নাই। এই জীবনের কোন দাম নাই। এখানে থাকতেও পারি না। কয়দিন পর পর ঘরও ভাইঙা দেয়। সরকারের লাথি-গুতা খাইয়া এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাই।

চল্লিশ বছর ধরে খিলগাঁও রেলগেট এলাকায় ভাসমান ঘর করে থাকেন হাসেম বেপারি (৬৫) ও তার স্ত্রী বানু বেগম (৫৫)। বার্ধক্যের কারণে ভারি কোন কাজ করতে পারেন না। জীবিকার তাগিদে ইট ভাঙার কাজ করে জীবন চালাচ্ছেন। কিন্তু কয়েকবছর ধরে তাদের জীবন আরো কঠিন হয়েছে। হাসেম বেপারি বলেন, চল্লিশ বছর আগে আট আনা (৫০ পয়শা) দিয়া চাইল খাইছি। এহন ৬০ টাকা কইরা চাইল। একটা ইলিশ মাছ চাইর আনা (২৫ পয়শা) দিয়া, এহন হেই ইলিশ দুই হাজার টাকা। আমরা কেমনে খাইয়া চলমু। এক বেলা খাইলে আরেক বেলা খাাইতে পারি না। আমাগো দেহার কেউ নাই। মাঝে মাঝে আমাগো ঘর ভাইঙা দেয়। পরে আবার দিয়া উঠাই। কেউ সাহায্য করে না।

মালিবাগ ফুটপাতে ছাউনি করে বসবাস করেন মনোয়ারা বেগম। ছোট একটা চৌকিতে পাঁচজনকে থাকতে হয়। এছাড়া কোন উপায়ও নেই। ঘর ভাড়া করে থাকার মতো সামর্থ্য নেই তাদের। মনোয়ারা বেগম জানান, আগে কোন রকম সংসার চলতো। কিন্তু এখন বাজারে সবকিছুর দাম বেড়েছে। অথচ তাদের আয় আগের থেকে অনেক কমেছে। দুই বছর ধরে তার স্বামী কোন কাজ করতে পারেন না। এক ছেলে রিক্সা চালান। এই উপার্জনে এখন সংসার চলে না। কোন বেলা খেয়ে না খেয়ে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে। মিন্টু মিয়া নামে একজন বলেন, আমাগো জয়গা সম্পদ নাই। সরকারে মাইনষেরে ঘরবাড়ি দেয়। আমাগো কিছু দেয় না। ত্রিশ বছর ধইরা রাস্তায় পইরা রইছি। কষ্ট কইরা চলতাছি। সরকার কি এগুলা দেহে না।

ফুটপাতে ঘরের সামনে মাটির চুলোয় ভাত বসিয়েছেন রহিমা বেগম। জীবনের করুণ আক্ষেপের কথা জানালেন তিনিও। রহিমা বলেন, রাস্তা দিয়া মানুষ হাটা-চলা করে। আমরা রাস্তায় রান্না করি, মানুষ দেখে। এসব যন্ত্রণা ভালো লাগে না। এরচেয়ে দুনিয়ার থেকে মরে গেলে ভালো। যন্ত্রণা থেকে বাঁচমু।
বিএনপি বাজার বস্তিতে বাস করা রিকশা চালক সামছুর বলেন, বছরে পাঁচ বার বাসের ভাড়া বাড়ানো হয়। কিন্তু আমাদের রিকশার ভাড়া বাড়ে না। তিন বছর আগেও একই ভাড়া নিতাম। তখন রিকশা চালিয়ে পরিবারকে ভালো মতো খাওয়াতে পারতাম। কিন্তু এখন পারছি না। প্রতিবছর চাল, ডাল, তেলসহ সবকিছুর দাম বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে আমরা রিকশা চালকরা বিপদে পড়েছি। রিকশা চালিয়ে যা আয় করি তা বাড়ি ভাড়া, বিদ্যুত বিল দিতে গিয়েই শেষ হয়ে যায়। আমার বউ পরের বাড়িতে কাজ করে যা আয় করে তা দিয়ে কোন রকম সংসার চলছে। ছেলে মেয়ের লেখাপড়া করাতে পারি না। সরকারের পক্ষ থেকে কোন ধরণের সহযোগিতা পাচ্ছি না।

জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট’র পিছনের গলীর রাস্তার ধারে বাস করা তাসলিমা বেগম দুই বছর আগেও পরিবার নিয়ে তিন বেলা খেয়ে দিন কাটাতেন। কিন্তু দ্রব্যমূল্যেল উর্ধ্বগতির কারনে এখন দুই বেলা খেয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে তার। তিনি বলেন, আমার স্বামী গত বছর মারা যান। এজন্য আমাকেই সংসার চালাতে হচ্ছে। পরের বাড়িতে কাজ করে যা রোজগার করি তা দুই সন্তান নিয়ে দুই বেলা খেয়ে বেঁচে আছি। তিনি বলেন, আমার দুই ছেলে-মেয়ে রাস্তায় ফুল বিক্রি করে। ওদেরকে পড়াতে পারিনি। সব জিনিসের দাম বেশি। অনেক দিন আমরা শুধুমাত্র ভাত খেয়েই থাকি। তরকারি খেতে পারি না। আমরা সরকারের সহযোগিতা চাই।