ছেঁড়া স্বপ্নের জাল


resma প্রকাশিত: ৯:২৬ পূর্বাহ্ণ ১ মে , ২০২২
ছেঁড়া স্বপ্নের জাল

সুলেখা আক্তার শান্তা: দিহানের মামার বাড়ি খুব কাছেই। বড় রাস্তা দিয়ে একটু এগিয়ে গেলেই বাড়িটা। গাছ গাছালীতে ঘেরা নিবিড় শান্ত পরিবেশ। ছোটবেলা থেকেই মামার বাড়ি তার আকর্ষণের জায়গা। আকর্ষণের আরেকটি কারণ মামাতো বোন মিলি। খেলার সাথী মিলিকে তার খুব পছন্দ ছোটবেলা থেকেই। মিলির কারণেই দিহান মামার বাড়ি পড়ে থাকে। শৈশব কৈশোর পেরিয়ে জীবন এগিয়ে চলে পূর্ণতার দিকে। পরিবর্তন ঘটে অনুভব অনুভূতির। দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে চায়। মিলিকে জানায় তার অন্তরের আকুতি।

মিলি জানো কেন আমি এখানে পড়ে থাকি? কেন তোমার পিছনে ঘুরঘুর করি। স্কুল পাড়ি দিয়ে, কলেজ তুমি যেখানেই যাও সব জায়গায় তোমার সাথে ছায়ার মতো ঘুরি।তোমার অনুসরণ করা আমাকে মাঝে মাঝে অস্বস্তিতে ফেলে। যেখানে যাই সেখানেই তুমি, বান্দা হাজির।কি করি বলো, তোমাকে ছাড়া এক মিনিট এক সেকেন্ডও ভালো লাগেনা যে।তুমি বিভিন্ন সময় নানা উপহার এটা সেটা এনে দাও এসব আমি কিছুই চাই না। এসব দিয়ে কি তুমি আমার মন জয় করতে চাও?না, ভাল লাগে তাই অমন করি।

দিহানের মিলিকে ভালো লাগে একথা ছোট-বড় সবাই জানে। দিহান মিলিকে ভালবাসার কথা প্রকাশ্যে বললেও মিলি কখনও মুখ ফুটে দিহানকে ভালোলাগা কিংবা ভালোবাসার কথা বলিনি। মিলির মুখ থেকে ভালোবাসার কথাটি শুনার জন্য দিহান ব্যাকুল হয়ে থাকে। মিলির মা রেহানা বিষয়টি বুঝতে পেরে দিহানকে বলেন, তুমি মামার বাড়ি আসো, থাকো, বেশ ভালো কথা কিন্তু এই যে মিলি মিলি করো এটা আমার মনপুতঃ না। মামির মনোভাবও দিহানের জন্য সহায়ক নয়। ঘনিষ্ঠতার অন্য কোন রূপ তৈরি হোক সেটা তার পছন্দ নয়। দিহান বিষয়টি মামিকে বোঝাতে মরিয়া হয়ে ওঠে।

আমি মিলিকে ভালোবাসি। ওর কাছ থেকে আড়ালে এক সেকেন্ডের জন্য থাকতে পারিনা। ওকে না পেলে পৃথিবীতে থাকব কি থাকব না তা জানিনা! আমার বাঁচার অক্সিজেন একমাত্র মিলি। নিরুপায় দিহান মিলির মা রেহানার পা ধরে কেঁদে বলে, মামি আপনি আমার মামি না আপনি আমার মা। মা কি সন্তানের চাওয়া অপূর্ণ রাখতে পারে?দিহান উঠ বাবা আমার কথা শোনো।না মামি যতক্ষণ আপনি আমার মতে সম্মতি না দিবেন ততক্ষণ আমি আপনার পা ছাড়বো না।আমি ভেবে দেখব।মামী আপনি কি চান আপনার চোখের সামনে একটা জীবন শেষ হয়ে যাক!

এসব তুমি কি বলছো? এসব পাগলামি ছাড়া কিছুই না। মিলি নাটকীয় দৃশ্য দেখছিল এতক্ষণ। ভালোবাসার এমন বিরক্তিকর প্রকাশ তার মোটেই পছন্দনীয় নয়। মা, ওর ওই উদ্ভট কান্ড কারখানা আমার মোটেই ভাল লাগেনা। ওকে আমার ভালো লাগে কিনা আমি তাকে ভালোবাসি কিনা সেই বিষয়টা তো তার জানতে হবে? যেখানে যাই সেখানে আমার পিছনে ঘুরঘুর করতে থাকে তার জন্য লোকজনের কানাঘুষা শুনতে হয়।দিহান আমি তোমার বাবা মার সাথে কথা বলবো।মামী তাহলে তো ভালই হয়। আপনি বাবা মাকে বলে আমাদের বিয়ে পড়ানোর ব্যবস্থা করেন।আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই না।

আমি যখন বিয়ের মালা তোমার গলায় পরিয়ে দেবো তখন দেখবো তুমি চাও কি চাও না।সেই আশাতেই থাকো। দেখা যাবে সময় মতো।হেনা কথা বলেন দিহানের বাবা-মার সঙ্গে। সমস্ত ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলতে চেষ্টা করে তাদের। হাবিব আর আনোয়ারা দুজনেই একসঙ্গে বলে ওঠে, ছেলে মেয়ের মত যেখানে সেখানে আমাদের অমত করার কি আছে!মিলির মত নেই আমার যতদূর জানা। আমারও একদমই মত নেই আত্মীয়র মধ্যে আত্মীয় করা।

আনোয়ারা উৎকন্ঠিত হয়ে বলেন, তোমার মত নেই মানে! আমাদেরও আত্মীয়র মধ্যে আত্মীয় করার ইচ্ছে নাই। শোনো, সেই আগের যুগ নাই এখন ছেলে মেয়ের মতেই মত দিতে হয়। চারিদিকে তাকিয়ে দেখো ছেলে-মেয়েরা তাদের নিজের পছন্দে বিয়ে করেছে। তাও তো ওরা ভালো, গার্জিয়ানের অপেক্ষায় আছে। রেহানা বলেন, আমার মেয়ের কিন্তু ইচ্ছা নেই যা ইচ্ছা আপনাদের ছেলের। হাবিব বলেন, নাও হয়েছে। ছেলেরা মুখ ফুটে বলতে পারে, মেয়েরা পারেনা। বাবা-মার উচিত ছেলে মেয়ের মঙ্গলের জন্য তাদের মতে মত দেওয়া।

ঠিক আছে আপনাদের যেখানে মত সেখানে আমি আর দ্বিমত করে থাকি কি করে। রেহানা ব্যাপারটা মেনে নেয়। আনোয়ারা হেসে বলেন, তাহলে মিষ্টিমুখ করা যাক।রেহেনা আনন্দের সাথে বলেন। তাহলে ভালো দিনক্ষণ দেখে বিয়ের তারিখ ঠিক করা যাক।নাফিজা বিদেশে পড়ালেখা শেষে দেশে ফেরে। সৌন্দর্যে তাকে রাজকুমারী বলা চলে। যেমন তার সৌন্দর্য তেমন মাথাভর্তি দীঘল কালো কেশ। অনন্য রূপসী সে। নাফিজা দিহানের ফুফাতো বোন। বিদেশ থেকে আসার পর মামার বাড়ি বেড়াতে আসে। দিহান নাফিজাকে দেখে চোখ ফেরাতে পারে না। মনে মনে ভাবে একি মানুষ না পরী। সঙ্কোচ ঝেড়ে বলেই ফেলে, অপূর্ব রূপবতী তুমি তোমার রুপ দেখে পাগল আমি।

এমন অপরূপ মুখখানা চোখের সামনে থেকে সরানো যে যায় না! শুরু হয় দিহানের মনের রাজ্যে নাফিজার বসবাস। নাফিজার পাগল করা রূপে মোজে গিয়ে এক সিদ্ধান্ত নেয়। সে যদি জীবনসঙ্গী করে তাহলে নাফিজাকেই জীবনসঙ্গী করবে। নাফিজা সহজ সরল মনের ঝুট ঝামেলা বুঝেনা। নাফিজাকে প্রেম নিবেদন করে দিহান। প্রেমের প্রস্তাবে নাফিজাও হ্যাঁ বলে দেয়। দিহান নাফিজাকে নিয়ে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ায়। মহা ব্যস্ত হয়ে পড়ে নাফিজাকে নিয়ে। আনোয়ারা এমন হাবভাব দেখে ছেলেকে বলেন, তোর তো বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। দিহান মহা আনন্দে বলে, হ্যাঁ মা, ছেলের বিয়ে অনেক বড় আয়োজন করবে যাতে নাফিজা অনেক আনন্দিত হয়।

নাফিজা?হ্যাঁ মা নাফিজা।আনোয়ারা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেন, তুইতো ভালোবাসিস মিলিকে!আমি মিলিকে নয় এখন আমি ভালোবাসি নাফিজাকে। আমি নাফিজাকেই চাই।নাফিজার বাবার অনেক টাকা, ও অনেক সুন্দরী সেজন্যই?মা মিলি তোমার ভাইয়ের মেয়ে সেই জন্যই কি তুমি মিলিকে ছেলের বউ করে আনতে চাও?আমি চাইলাম কখন? তুইতো মিলির জন্য পাগল ছিলি। তোর এই সব কাণ্ড নিয়ে আমরা সমাজে মুখ দেখাবো কি ভাবে! ছেলের এমন সিদ্ধান্তে মা ছেলের মধ্যে দ্বন্দ্ব হয়।