ঝুঁকিতে চট্টগ্রাম বন্দর


sraboni প্রকাশিত: ১০:২২ পূর্বাহ্ণ ৩ মার্চ , ২০২২
ঝুঁকিতে চট্টগ্রাম বন্দর

নিজস্ব প্রতিবেদক: নৌপথে পণ্য বহনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বাহনের নাম বাল্কহেড। প্রচলিত ভাষায় ‘ভলগেট’ হিসেবে পরিচিত এসব নৌযান। চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেল দিয়েই বাল্কহেড প্রবেশ করে কর্ণফুলী নদীতে। বর্তমানে লাইটার জাহাজের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত পণ্যবাহী এ ধরনের তিন শতাধিক অবৈধ বাল্কহেড ঝুঁকিতে ফেলছে বন্দর চ্যানেলকে।

বাল্কহেডগুলো এমনভাবে তৈরি, পণ্যবোঝাই করলে নৌযানটি পানিতে প্রায় ডুবে যায়। বিশেষ করে বালুভর্তি বাল্কহেড চলাচল করলে সামান্য দূর থেকেও দেখা যায় না। একইভাবে বহির্নোঙর থেকে মাদার ভ্যাসেল থেকে কয়লা কিংবা পাথরবাহী বাল্কহেড সমুদ্রপথেই দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াত করছে। বিশেষ করে পাথর নিয়ে রাজবাড়ি, মীরসরাই, কুতুবদিয়া, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াত করে। আবার বন্দরের মধ্য দিয়ে সদরঘাট, জুট র‌্যালি, গ্যাস র‌্যালি ঘাটেও পাথর খালাস করে। মহেশখালী পাওয়ার হাব, কুতুবদিয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের উন্নয়ন কাজের নির্মাণসামগ্রী বহনে বেশিরভাগ ব্যবহার হয় বাল্কহেড।

বর্তমানে তিন শতাধিক অবৈধ বাল্কহেড রয়েছে। এসব বাল্কহেড আবার দিনরাত আউটার (বহির্নোঙর) থেকে পণ্য খালাস নিচ্ছে। দিনে কর্ণফুলী নদীতেই নোঙর অবস্থায় থাকে অসংখ্য বাল্কহেড। বন্দর কর্তৃপক্ষ মাঝে মধ্যে সামান্য জরিমানা করে তাদের দায় সারেন। অথচ একটি বাল্কহেড ডুবলেই বন্দরের অপারেশন পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হতে পারে

বুধবার (২ মার্চ) সকালে সরেজমিনে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের ভেল্লাপাড়া সেতু লাগোয়া দক্ষিণ পাশেই ‘আল মাহাদী’ নামের একটি বাল্কহেড থেকে পাথর আনলোড করে ট্রাকে ভর্তি করা হচ্ছে। এজন্য শিকলবাহা খালের পাড়ে ক্রেনবাহী বার্জ যুক্ত করা হয়েছে। বার্জের ক্রেন দিয়ে বাল্কহেড থেকে সরাসরি ট্রাকে পাথর আনলোড করা হচ্ছে।স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাতে বহির্নোঙর অবস্থান করা মাদার ভ্যাসেল থেকে লোড করা হয় এ বাল্কহেড।

অভিযোগ উঠেছে, অবৈধ বাল্কহেড দিয়েই বহির্নোঙর হতে মাদারভ্যাসেল থেকে কয়লা, পাথরসহ বিভিন্ন পণ্য খালাস নিচ্ছে শিপ হ্যান্ডলিংয়ে জড়িত থাকা একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। আবার অবৈধ বাল্কহেডের বিরুদ্ধে অভিযানের নামে শুধু জরিমানা করেই দায় সারছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, বাল্কহেডকে লাইটারেজের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। বন্দর চ্যানেলকে নিরাপদ করতে এসব বাল্কহেডের চলাচলরোধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কর্ণফুলী নদী ঘিরে বালু ব্যবসায়ীরা মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জসহ দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি জেলা থেকে অবৈধ বাল্কহেড সংগ্রহ করে বালুবোঝাই ও পরিবহন করে আসছে। কর্ণফুলী নদী থেকে বালুবোঝাই করে এসব বাল্কহেড শিকলবাহা খাল, ভেল্লাপাড়া, মুরালী খাল, সাঙ্গু নদী, চানখালী খাল, মিলিটারিপুল এলাকায় বালু বহন করে। আবার কয়েক বছর ধরে আমদানিকৃত কয়লা, পাথর, সারের মতো বাল্ক পণ্য লাইটারিংয়ের কাজেও এসব বাল্কহেড ব্যবহার করছে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট।

বে-ক্রসিংয়ে নৌযান চলাচলের অনুমতি দেয় ডিজি শিপিং (নৌপরিবহন অধিদপ্তর)। নিষেধাজ্ঞাও দেন তারা। তবে অবৈধ বাল্কহেড চলাচল বন্দর চ্যানেলের জন্য বড় ঝুঁকি। এজন্য আমরা বন্দরের পক্ষ থেকে ডিজি শিপিংকে অনুরোধ করি এ ধরনের নৌযানের অনুমোদন না দেওয়ার জন্য

বাংলাদেশ ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআইডব্লিউটিএ) সূত্রে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে কোনো ধরনের কারিগরি নকশা ছাড়াই মিস্ত্রি ও ওয়েল্ডারের পরিকল্পনায় এসব বাল্কহেড নির্মাণ করা হচ্ছে। যারা এ নৌযান তৈরির সঙ্গে জড়িত তাদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও নেই। নির্মাণকারী ডকইয়ার্ডগুলোরও কোনো বৈধ অনুমতির কাগজপত্র নেই। এমনকি এসব নৌযানের কোনো হুইল থাকে না।

বন্দরে চ্যানেলের ঝুঁকির বিষয়ে কথা হলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের হারবার মাস্টার ক্যাপ্টেন জহিরুল ইসলাম , ‘বাল্কহেড চলাচলে চট্টগ্রাম বন্দরের কোনো অনুমোদন নেই। চট্টগ্রাম বন্দরে সি ক্লাস (কোস্টাল) জাহাজ চলাচল করতে পারে। নির্ধারিত কিছু সময়ের জন্য এম ক্লাস (মাদার ভ্যাসেল) জাহাজ চলাচল করতে পারে। কিন্তু বাল্কহেডগুলো বন্দর দিয়ে চলাচল করে কোনো অনুমতি ছাড়াই। তাছাড়া এসব বাল্কহেডে কোনো প্রশিক্ষিত জনবল নেই। এগুলো যে কোনো সময় দুর্ঘটনায় পড়লে আমাদের (বন্দর) চ্যানেলের জন্য ক্ষতি। এ ধরনের দুর্ঘটনা যদি চ্যানেলের মধ্যখানে হয় সেক্ষেত্রে বন্দরের জাহাজ অপারেশন বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়বে বলে মনে করেন এ অভিজ্ঞ কর্মকর্তা।

জানা যায়, শিপ হ্যান্ডলিংয়ে জড়িত একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পণ্য লাইটারিংয়ের জন্য অবৈধ বাল্কহেড ব্যবহার করে আসছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন ধরে এসব বাল্কহেড ব্যবহার বন্ধে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেও রোধ করতে পারেনি বাল্কহেডের ব্যবহার। সর্বশেষ ২০২১ সালের শুরুতে বেশ কয়েকটি বাল্কহেড দুর্ঘটনার পর সমালোচনা ওঠায় জাহাজ মালিক, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর, শিপিং এজেন্ট, ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল (ডব্লিউটিসি) ও লাইটার জাহাজ ঠিকাদারদের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও নৌ বাণিজ্য অধিদপ্তর বৈঠক করে বাল্কহেড চলাচলে বন্ধে কঠোর হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও রহস্যজনক কারণে গত এক বছরে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি সরকারি সংস্থাগুলোর।

ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের (ডব্লিউটিসি) নির্বাহী পরিচালক মাহবুব রশিদ খান বলেন, ‘বাল্কহেড নিয়ে বলতে বলতে আমরা হয়রান হয়ে গেছি। আমরা এখন আর কথা বলতে চাই না। এ বিষয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ ভালো বলতে পারেন।’

তবে ডব্লিউটিসির আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘বর্তমানে তিন শতাধিক অবৈধ বাল্কহেড রয়েছে। এসব বাল্কহেড আবার দিনরাতে আউটার (বহির্নোঙর) থেকে পণ্য খালাস নিচ্ছে। দিনে কর্ণফুলী নদীতেই নোঙর অবস্থায় থাকে অসংখ্য বাল্কহেড। বন্দর কর্তৃপক্ষ মাঝে মধ্যে সামান্য জরিমানা করে তাদের দায় সারেন। অথচ একটি বাল্কহেড ডুবলেই বন্দরের অপারেশন পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হতে পারে।’

এ বিষয়ে বন্দর সচিব ওমর ফারুক বলেন, ‘বে-ক্রসিংয়ে নৌযান চলাচলের অনুমতি দেয় ডিজি শিপিং (নৌ পরিবহন অধিদপ্তর)। নিষেধাজ্ঞাও দেন তারা। তবে অবৈধ বাল্কহেড চলাচল বন্দর চ্যানেলের জন্য বড় ঝুঁকি। এজন্য আমরা বন্দরের পক্ষ থেকে ডিজি শিপিংকে অনুরোধ করি এ ধরনের নৌযানের অনুমোদন না দেওয়ার জন্য। আবার অনুমোদনহীন নৌযান কিংবা বাল্কহেড বন্দর চ্যানেল দিয়ে চলাচল করলে আমরা আমাদের ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করে ব্যবস্থা নেই।’