আতিক হাসান : টাইটানিক নামক বিশাল জাহাজের সাথে পরিচিত নয় এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবেনা বললেই চলে। বিশেষ করে জেমস ক্যামেরনের “TITANIC” সিনেমার পরে এই টাইটানিককে যেন আমরা নতুন এক ভিন্ন রূপে দেখতে পাই। সেই ডুবে যাওয়ার দৃশ্য দেখেছে অথচ কাঁদেনি এমন একটিও লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু আসলেই কি এই টাইটানিক ডুবেছিল নাকি এখানেও কোন রহস্য লুকিয়ে আছে

চলুন কিছুক্ষনের জন্য অতীতে ফিরে যাই আর দেখে আসি কি ঘটেছিলো আটলান্টিক মহাসাগরে ১০৬ বছর আগে? এই টাইটানিকের এর ডিজাইনার “থমাস এন্ড্রু” যখন টাইটানিক বানানো হয় তখন দাবি করেছিলেন এই টাইটানিক কোন দিন ডুববে না। এখন হয়তো আপনারা ভাবতে পারেন যে, এইরকম একটা দাবির পিছনে কি কারণ থাকতে পারে? এর মূল কারণ খুঁজে পাওয়া যায় টাইটানিকের নকশায়।

টাইটানিক জাহাজটি তৈরী করার সময় একে এমন ভাবেই তৈরী করা হয়েছিল যে এর মধ্যে ছিল অনেক গুলি কম্পার্টমেন্ট, যে গুলি একটি আরেকটি থেকে আলাদা এবং মধ্যবর্তী যাতায়াতের দরজা গুলিতে ছিল সম্পূর্ন পানি রোধক দরজার ব্যবস্থা। এই রকম কম্পার্টমেন্ট টাইটানিকেই প্রথম যুক্ত করা হয়,এর আগে কখনো,কোন জাহাজে এরকম কমপার্টমেন্ট যুক্ত করা হয়নি। আর এখন পর্যন্ত বর্তমানে বিশ্বের প্রতিটি জাহাজে এবং ডুবোজাহাজে ব্যবহৃত হচ্ছে এই কম্পার্টমেন্ট ব্যবস্থা।

এখন জানবো এই কম্পার্টমেন্ট থাকলে কি কি সুবিধা পাওয়া যায়? তার আগে লোহার তৈরী জাহাজ কিভাবে পানিতে ভাসে তা সম্পর্কে একটু ধারনা করা যাক। পানিতে কোন বস্তু ভাসার মূল তত্ত্ব হল, “বস্তু কতৃক অপসারিত পানির ওজন যদি বস্তু হতে বেশি হয় তাহলে যে কোন বস্তু পানিতে ভাসতে পারবে।” আমরা যারা বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশুনা করেছি তারা খুব সহজেই এই তত্ত্ব বুঝতে পারবো। এবার আসি কম্পার্টমেন্টের কথায়, ধরুন কোন এক জাহাজের মধ্যে মোট দশটি কম্পার্টমেন্ট আছে এখন কোন এক দুর্ঘটনায় জাহাজের বাইরের কোন অংশে ছিদ্র হয়ে গেলো। আর সেখান থেকে পানি ঢোকা শুরু করলো। এসময় ক্যাপ্টেইনের আদেশে জাহাজের যে অংশ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে শুধু মাত্র সেই অংশের কম্পার্টমেন্ট বন্ধ করে দিলে জাহাজের মধ্যে ঢোকা পানি শুধু মাত্র জাহাজের একটি কম্পার্টমেন্টকে পূর্ন করবে, কিন্তু জাহাজের বাদবাকি অংশে পানি ঢুকতে পারবে না। এর ফলে জাহাজে বিশাল ছিদ্র থাকা স্বত্ত্বেও তা অনায়াসে পানিতে ভেসে থাকতে পারবে, কেননা ঐযে তত্ত্ব জাহাজ কতৃক অপসারিত পানির ওজন জাহাজের তুলনায় বেশি থাকবে সেই কারণে।

এবার আসি মূল ঘটনায়, প্রায় ১০৬ বছর আগে ১৯১২ সালের ১৫ই এপ্রিল আটলান্টিক মহাসাগরে টাইটানিক নামের বিশাল জাহাজটি ডুবে যায়। আর এই দূর্ঘটনায় প্রান হারায় ১৫১৭ জন। ইতিহাসে একই সাথে এত প্রানহানী বিরল এক ঘটনা। আর এই প্রানহানী ঘটেছিল টাইটানিক নামে এক বিশাল জাহাজ ডুবিতে। এ নিয়ে অবশ্য “হারিয়ে যাওয়া টাইটানিক” লেখায় বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছিল।

এই জাহাজ ডুবির ৮৭ বছর পূর্তি বছরে অর্থাৎ ১৯৯৯ সালে ৬৪ বছর বয়স্ক আক্সফোর্ডের “রবিন গার্ডনার” (Robin Gardiner) তার লেখা বই: TITANIC : The Ship that Never Sank?” এ দাবি করেন যে টাইটানিক কখনই ডুবে নাই। আর তার দাবি অনেকটাই মিলে যায় কথিত টাইটানিক এর বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের দেওয়া সাক্ষ্যের সাথে। বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের মতে ডুবে যাওয়া টাইটানিকের লোগো (Logo) ছিল অন্যরকম। তা কোন মতেই টাইটানিকের সাথে মিলে না।

রবিন গার্ডনার এর মতে ১৫ই এপ্রিল ১৯১২ সালে যে জাহাজটি ডুবেছিল সেটি ছিল “অলিম্পিক” (Olympic) নামের আরেকটি জাহাজ। বিশ্বাস করতে পারছেন না,তাইতো? না পারারই কথা।আসলে জাহাজ দুটি একদম এক রকম দেখতে আর তা বানিয়েছে একই কোম্পানি এবং সার্ভিসে ছিল একই কোম্পানির অধীনে। অনভিজ্ঞ লোকদের পক্ষে পার্থক্য শুধু মাত্র জাহাজের গায়ে লেখা নাম। তা না হলে এই পার্থক্য ধরা কোন অনভিজ্ঞ লোকের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। এদের দুজনার বাহ্যিক আকৃতি এতটাই মিল যে আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না।

আপনাদের মনে আছে নিশ্চয়ই প্রথমে বলেছিলাম এই রকম কম্পার্টমেন্ট টাইটানিকেই প্রথম যুক্ত করা হয়,এর আগে কখনো,কোন জাহাজে এরকম কমপার্টমেন্ট যুক্ত করা হয়নি। আর টাইটানিক কিন্তু বানানো হয়েছিল এই অলিম্পিকের পরে অর্থাৎ অলিম্পিকে এরকম কম্পার্টমেন্ট ব্যবস্থা ছিল না। ঘটনার শুরু হয় কিছুটা এরকম ভাবে, টাইটানিক আর অলিম্পিক ছিল White Star Line কোম্পানির অধীনে। আর এই কম্পানির মালিক ছিলেন “জে.পি.মরগান” (J.P.Morgan)। একজন বিশিষ্ট চতুর ব্যবসায়ি এবং ধনকুবের হিসেবে বেশ খ্যাতি ছিল তার।

তার কোম্পানি “White Star Line” এর জাহাজ “অলিম্পিক” এর আকস্মিকভাবে “হক” (Hawke) নামের আরেকটি জাহাজের সাথে দূর্ঘটনা ঘটে। যদিও অলিম্পিকের ইন্স্যুরেন্স করানো ছিল কিন্তু ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এর ফলে তিনি কিছুটা আর্থিক সংকটে পরেন।অলিম্পিককে পুনঃরায় চলাচলের উপযোগী করে তুলতে জে.পি. মরগানকে অনেক টাকা খরচ করতে হয়। এর ফলেই তার আর্থিক সংকট আরও বেড়ে যায়। আবার সামনে তার নতুন জাহাজের উদ্ভোধন অনুষ্ঠান। চারিদিক থেকে বেশ চাপের উপর ছিলেন। প্রথমেই বলেছি তিনি একজন চতুর ব্যবসায়ি ছিলেন। তিনি এসময় একটা কথা রটিয়ে দেন যে, তার কাছে যে পরিমান স্বর্ন আছে তা তিনি টাইটানিকে করে নিউইয়র্কে নিয়ে যাবেন আর নতুন ভাবে ব্যবসা শুরু করবেন। জাহাজের ব্যবসায় তিনি তেমন একটা লাভ করতে পারছেন না। আর এরই সাথে তিনি তার সোনার ইন্স্যুরেন্সও করিয়ে নেন। যদি সোনা চুরি যায় বা দূর্ঘটনায় নষ্ট হয় তাহলে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি তাকে ৮ মিলিয়ন ডলার দিবে। সালটা ছিল ১৯১২ তখন ৮ মিলিয়ন ডলারের কেমন দাম হতে পারে ভেবে দেখেছেন?

রবিন গার্ডনার এর মতে, জে.পি. মরগান এক ভয়ংকর পরিকল্পনা করেন। জে.পি. মরগান চেয়ে ছিলেন টাইটানিকের বদলে যাবে অলিম্পিক, কেননা টাইটানিক আর অলিম্পিককে দেখে আলাদা করা তেমন একটা সহজ ব্যাপার নয়। আর যেহেতু অলিম্পিক ইতি মধ্যেই কারখানায় আছে ঠিক করার জন্য তাই একে নতুন করে সকলের সামনে টাইটানিক বলে চালিয়ে দেওয়া অনেকটাই সহজ হবে। আর যাত্রা মধ্য পথে ছোট একটা দূর্ঘটনায় যদি জাহাজ ডুবে যায় আর তাতে যদি সোনা থাকে তাহলে সোনা হারানোর ইন্স্যুরেন্স পাওয়া যাবে আবার টাইটানিকের ইন্স্যুরেন্সও পাওয়া যাবে। তিনি আসলেই সোনা পাঠিয়েছিলে কিনা সেই বিতর্কের এখনও কোন সুরাহা হয়নি। আর পর্যাপ্ত পরিমান লাইফ বোট থাকলে যাত্রীদের বাঁচানো সম্ভব হবে। আর টাইটানিককে অলিম্পিক বলে চালানো যাবে, সাথে ব্যবসাও হবে।

কিন্তু তার করা প্ল্যান যে কিছু ব্যর্থও হয়েছে ১৫১৭টি তাজা প্রান নির্মমভাবে নিষ্প্রাণ হয়ে যাওয়াটাই তার প্রমাণ।টাইটানিকের যে সকল যাত্রী বেঁচে ফিরতে পেরেছিলেন তারা কেউ বিশ্বাস করতে পারেননি যে, শুধু মাত্র বরফে ধাক্কা লাগার কারনে এত বড় জাহাজ ডোবা সম্ভব। তাদের মতে, টাইটানিকের যখন বরফের সাথে ধাক্কা লাগে তখন হালকা শব্দ হয়েছিলো। যদি বরফ খন্ডটি এত বেশি বড় থাকত তাহলে জাহাজটিতে ধাক্কা লাগার ফলে যাত্রীরা অবশ্যই অনেক জোড়ে শব্দ এবং কম্পন অনুভব করতেন। কিন্তু তারা এরকম কিছুই টের পাননি।

এবার কিছু যুক্তিতে আসি, কোন কারনে ৪৬,৩২৮ টনের টাইটানিক বরফের সাথে ধাক্কা খেয়ে তার পাশের দিকে ছিদ্র হয়ে যায়। যার ফলে পানি ঢুকতে থাকে। তাহলে কম্পার্টমেন্ট গুলি বন্ধ করে দিলেইতো হতো। জাহাজের গায়ে এত বড় ছিদ্র হয়নি যে সম্পূর্ন জাহাজের প্রতিটি কম্পার্টমেন্টে সেই ছিদ্র দিয়ে পানি প্রবেশ করতে পারবে। আচ্ছা আসলেও কি কম্পার্টমেন্ট ছিলো? অলিম্পিক কিন্তু টাইটানিকের আগে তৈরী করা হয়েছিলো,যার কারণে অলিম্পিকে কিন্তু কম্পার্টমেন্ট না থাকারই কথা।

অলিম্পিককে যখন রেজিষ্ট্রেশন করানো হয় তখন এর ওজন ছিল ৪৫,৩২৪ টন কিন্তু ১৯১২ সালে টাইটানিক ঢুবির পরের বছর অর্থাৎ ১৯১৩ সালে অলিম্পিকের পুনঃওজন করা হয় রেজিষ্ট্রেশন নবায়নের জন্য। তখন এর ওজন হয় টাইটানিকের রেজিষ্ট্রেশন করা ওজনের সমান, অর্থাৎ ৪৬,৩২৮ টন। তাহলে কি ১৯১৩ সালের অলিম্পিকই আসল টাইটানিক? আচ্ছা পানির নিচে টাইটানিককে খুঁজে বের করার মূল উদ্দেশ্য কি হতে পারে? একবার ভাবুনতো যে জাহাজ ডুবে গেছে সেই জাহাজ খুঁজে বের করতে কেন কেউ টাকা নষ্ট করবে? এই সব খোঁজাখুঁজির মূল উদ্দেশ্য ছিল জে.পি.মরগানের[1] হারিয়ে যাওয়া সোনা খুঁজে বের করা। বর্তমান বাজারে এর মূল্য কতো একবার হিসাব করে দেখুন। কিন্তু দুঃখের বিষয় এতো খোঁজাখুঁজির পরও কিন্তু সেই সোনা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।আসলেও সোনা ছিলো কিনা সেটাও এখন একটা রহস্য!!

টাইটানিকের জীবনে আসলে কি হয়েছে তা হয়ত কোন দিন জানা যাবে না। কিন্তু ১৫ই এপ্রিলের সেই ১৫১৭ জন যাত্রীর মৃত্যুর সাক্ষি হয়ে সমুদ্রের নিচে এখনও ঠায় দাঁড়িয়ে আছে টাইটানিক। সমুদ্রের নিচে টাইটানিক জাহাজ প্রথম আবিস্কার করেন “বালার্ড”। বালার্ড টাইটানিক আবিষ্কার করার পর থেকেই মানুষ সাবমেরিনে করে সেখানে ঘুরতে যায়। এই সাবমেরিনগুলো টাইটানিকের যে সব জায়গায় ল্যান্ড করে, সেসব জায়গাতে দাগ তো পড়েছেই, অনেক জায়গায় গর্তও হয়ে গেছে। আর ঘুরতে গিয়ে মানুষ জাহাজ থেকে প্রায় ৬ হাজার জিনিস নিয়ে গেছে। এমনকি অনেকে নিয়ে গেছে জাহাজের টুকরোও!

তখন থেকেই টাইটানিকের ধ্বংসাবশেষ সংরক্ষণের দাবি ওঠে। আর তাই ইউনেস্কো টাইটানিকের[2] ধ্বংসাবশেষকে আন্ডারওয়াটার ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা করে।১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ, আমরা অনেক অনুষ্ঠান করে দিনটি পালন করি। কিন্তু পরের দিন অর্থাৎ ১৫ই এপ্রিল স্মরণ করলে মনে পড়ে যাবে টাইটানিকের সাথে ডুবে যাওয়া ১৫শ’ মানুষের কথা। যারা সেদিন কারো লোভের ফল ভোগ করেছিলো