দশ বছরে লোকসান ৪১৭২ কোটি টাকা


meherin প্রকাশিত: ৯:৪৩ পূর্বাহ্ণ ৬ মার্চ , ২০২২
দশ বছরে লোকসান ৪১৭২ কোটি টাকা

অর্থনীতি ডেস্ক : এক সময়ে দেশের গৌরবের সোনালি আঁশ। বর্তমানে অর্থনীতির অন্যতম দায় দেশের পাটখাত। মুনাফা তো দূরের কথা, ১০ বছরে সরকারের ২৫টি জুট মিলে লোকসান দিতে হয়েছে ৪ হাজার ১৭২ কোটি টাকা। আর জুট মিলসহ সামগ্রিকভাবে পাট খাতকে বাঁচিয়ে রাখতে ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। দুর্নীতি-অনিয়মসহ নানা সীমাবদ্ধতায় এ অবস্থা তৈরি হয়েছে। তবে বাংলাদেশে পাটের জীবন রহস্য আবিষ্কারের পর নতুন করে সম্ভাবনা কাজে লাগাতে নানা উদ্যোগের কথা বলছে সরকার। এ বাস্তবতা সামনে রেখে ষষ্ঠবারের মতো আজ দেশে পালিত হচ্ছে জাতীয় পাট দিবস। এবারের পাট দিবসের প্রতিপাদ্য, ‘সোনালি আঁশের সোনার দেশ, পরিবেশবান্ধব বাংলাদেশ।’ দিবসটি উপলক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণী দিয়েছেন।

জানা গেছে, পাট খাতের এ দুরবস্থার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত হয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে সীমাহীন দুর্নীতি, অদক্ষতা, আধুনিক প্রযুক্তির অভাব, শ্রমিক ইউনিয়নের স্বেচ্ছাচারিতা, সুস্থ প্রতিযোগিতার অভাব এবং সরকারের অবহেলা। তবে সম্ভাবনাও কম নয়। কারণ বিশ্বে পাট ও পাটজাত পণ্যের বাজার ৫ হাজার কোটি (৫০ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারের। এরমধ্যে চীনের দখলে অধিকাংশ বাজার থাকলেও বাংলাদেশের অবস্থান আছে ছোট আকারে। ২০১৮ সালে ইউরোপের বাজারে সিনথেটিক পণ্য নিষিদ্ধ হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী বাড়ছে বায়োডাইবারফিকেশন ব্যাগ ও পণ্যের চাহিদা। যা বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

পাটের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে ষষ্ঠবারের মতো এবার জাতীয় পাট দিবস পালন করবে সরকার। দিবসটি উপলক্ষ্যে তিন দিনব্যাপী নানান কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া এ খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে-পাট খাতে গবেষণা বাড়ানো, নতুন পাট নীতি প্রণয়ন, সংস্কারের আওতায় আসছে জুট মিল করপোরেশন এবং পণ্যের ব্যবহার পলিথিনের ওপর ইকো ট্যাক্স আরোপ। এসব উদ্যোগের দুটি উদ্দেশ্য। একদিকে দেশে পাট পণ্যের ব্যবহার বাড়ানো এবং অন্যদিকে রপ্তানি বাড়ানো। সব মিলে এ খাতের বিশাল বাজার সৃষ্টি করতে কর্মসংস্থান বাড়াতে চায় সরকার। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ খাতে সম্ভাবনা কাজে লাগাতে কার্যকর উদ্যোগ জরুরি। জানতে চাইলে তত্ত্বাধবায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, জন্মরহস্য আবিষ্কার হওয়ায় পাটের সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। বিশ্ববাজারেও পাটপণ্যের চাহিদা রয়েছে। ফলে এসব সম্ভাবনা কাজে লাগাতে এ খাতে বিনিয়োগ জরুরি। তিনি বলেন, এ খাতে গবেষণা আরও বাড়াতে হবে।

জানা গেছে- ২০১৩ সালে দেশীয় পাটের জন্মরহস্য আবিষ্কার করে বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা। ফলে জীবাণপ্রতিরোধক পাট উৎপাদন করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি দেশি পাট দিয়ে বস্ত্রশিল্পের উপযোগী সুতা উৎপাদন করাও সম্ভব। আর এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতেই নানা উদ্যোগ। এদিকে পলিথিনের মোড়ক ব্যবহার করে পণ্য বাজারজাত করে এমন কোম্পানির ওপর এক শতাংশ ইকো ট্যাক্স আরোপ করা হয়। অবৈধ পলিথিন নির্মূল ও পলিথিন রি-সাইক্লিংয়ের জন্য এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো সূত্র জানায়, পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ ১১৬ দশমিক ১৪ লাখ ডলারের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেছে। আর চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৪২ কোটি ডলারের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যা গত অর্থবছরের চেয়ে ২৬ কোটি ডলার বেশি। পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে প্রতিবছর ১২ দশমিক ৩৫ লাখ একর জমিতে পাট চাষ হয়। এতে মোট উৎপাদনের পরিমাণ ৮০ লাখের বেশি। মোট উৎপাদনের ৭৫ শতাংশই দেশে ব্যবহার হয়। বর্তমানে দেশে জুট মিলের সংখ্যা ২০৩টি। এরমধ্যে বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) আওতায় ২৫টি। বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএসএ) আওতায় ৮১টি এবং বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশনের আওতায় ৯৭টি। সরকারি হিসাবে তিন খাতে মোট শ্রমিক ১ লাখ ৫৬ হাজার ৫৪৯।

১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল আদমজী পাটকল। পরে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনা অঞ্চলে গড়ে ওঠে অনেক পাটকল যার বেশিরভাগই ছিল লাভজনক। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে প্রথমে ৬৭টি পাটকলকে সরকারি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়। পরে আরও পাটকল সরকারি করে বিজেএমসির আওতায় আনা হয় মোট ৮২টি পাটকলকে। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর নেতৃত্ব ও কর্মপরিকল্পনায় কার্যকর কোনো কর্মপরিকল্পনা কখনো হয়নি, যা ক্রমশ পাটকলগুলোকে দুর্বল করেছে।২০০২ সালে আদমজী জুট মিলস বন্ধ করা হয়। এরপর বিজেএমসির নিয়ন্ত্রণাধীনে বর্তমানে পাটকল আছে ৩২টি। ৫টি মিলের মামলা আদালতে বিচারাধীন। একটিতে ভিসকোস উৎপাদন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। আর একটিতে বিক্রয়োত্তর মামলা রয়েছে। সর্বশেষ তিনটি নন-জুট মিলসহ সচল ছিল ২৫টি।
তবে অব্যাহত লোকসানের কারণে ২০২০ সালের জুলাইয়ে সব পাটকল বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। মিলগুলো বন্ধ থাকায় গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে স্বেচ্ছায় অবসর বা গোল্ডেন হ্যান্ডশেকে শ্রমিকদের পাওনা নগদ ও সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে পরিশোধ করা হচ্ছে। ৪টি মিলের (জাতীয়, খালিশপুর, দৌলতপুর ও কেএফডি) মিলের শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি পরিশোধ করা হয়েছে। বন্ধ থাকা এসব জুটমিলের মধ্যে ১৭টি ইজারা দিচ্ছে সরকার। এসব মিলগুলোর ৫টি চট্টগ্রাম অঞ্চলের, ঢাকা অঞ্চলের ৪টি ও খুলনা অঞ্চলের ৮টি। বিজেএমসির তথ্যানুযায়ী, ঢাকা জোনে পাটকল ৭টি। যার মধ্যে চারটি ইজারা দেওয়া হবে। চট্টগ্রাম জোনে মিল ১০টি, যার মধ্যে পাঁচটি ইজারা দেওয়া হবে।

সূত্র আরও জানায়, দেশে পাট খাতে এখন বেশ সাড়া মিলেছে। এজন্য প্রায় এক দশক পরে নীতিমালা তৈরি হয়েছে। এই নীতিতে বন্ধ হওয়া সরকারি পাটকলগুলো ক্রমান্বয়ে চালুর ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার এবং পাটপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে আইনগত প্রতিবন্ধকতা দূর করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পাট বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনায় বিএডিসির সক্ষমতা বাড়ানো, পাটচাষিদের অর্থ সংকট লাঘবে সহজ শর্তে ঋণ প্রদান, বিক্রয়ের সঙ্গে সঙ্গে পাটচাষিরা অর্থ পেয়ে যান- এসব বিষয় পাটনীতিতে স্পষ্ট করে তুলে ধরা হচ্ছে।

বর্তমানে ভারত, পাকিস্তান, আইভোরিকোস্ট, ব্রাজিল, ইথিওপিয়া, জার্মানি, স্পেন, ইংল্যান্ড, মিসর, চীন, জাপানসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের কাঁচা পাট ও পাটজাত পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। দেশের ভেতরেও পাটজাত পণ্যের বাজার সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছে বেসরকারি পাটকলগুলো। তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি এ খাতে সমস্যাও কম নেই। উন্নত জাতের বীজ, আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার, দক্ষ শ্রমিক, পণ্য বৈচিত্র্যকরণ ও বিপণন কৌশলের অভাব রয়েছে পাট শিল্পে। সহযোগিতাও নেই পাট গবেষণায়। এসব দিকে এখনই নজর না দিলে বিশ্ব বাজারে অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হবে। এক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকেও এগিয়ে আসতে হবে। এ খাতের ব্যবসায়ীরা মনে করেন, সরকারের সহযোগিতা পেলে এ খাত ছাড়িয়ে যেতে পারে তৈরি পোশাক শিল্পকে। এজন্য গুরুত্ব দিতে হবে বীজ উৎপাদনে। কারণ মানসম্মত বীজের অভাব রয়েছে।

জানা গেছে, স্থানীয়ভাবে সাড়ে ১২শ টন উৎপাদন হলেও পাট বীজের বার্ষিক চাহিদা প্রায় পাঁচ হাজার টন। ফলে ভারত বা চীন থেকে প্রতিবছর বীজ আমদানিতে চলে যাচ্ছে বড় অঙ্কের অর্থ। তবে পাট খাতে সরকারি বিনিয়োগে অসন্তোষ অবস্থানে রয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। এ সংস্থার মতে, অদক্ষতা, লুটপাট, শ্রমিক অসন্তোষের কারণে লোকসানি মিলগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে নতুন করে পাটের পুনর্জাগরণে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিতের (পিপিপি) ভিত্তিতে পুনরায় পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইতোমধ্যে এ খাতের উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে ‘পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন-২০১০’ এবং এ সংক্রান্ত বিধিমালা দেশের পরিবেশ রক্ষায় ও জনস্বার্থ সুরক্ষায় ইতিবাচক ধারা সৃষ্টি করেছে। ‘পাট আইন-২০১৭’ ও ‘জাতীয় পাটনীতি-২০১৮’ পাট খাতের সার্বিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হিসাবে কাজ করছে। শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য বাংলাদেশকে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসাবে বিশ্বসভায় প্রতিষ্ঠিত করা।

গোলাম দস্তগীর গাজী বলেন, বিশ্বে পলিথিনের ব্যবহার বাড়লেও টেকসই উন্নয়নের যুগে পরিবেশবান্ধব পাটপণ্যের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে। এ কারণে পাটকে নিয়ে বড় ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে সরকার। এরমধ্যে রয়েছে-পাট পণ্যের প্রসার ও বাজার সম্প্রসারণ, পাটচাষি পাটপণ্যের উৎপাদনকারী ব্যবসায়ীদের সহায়তা, বহুমুখী পাটজাত পণ্যের উদ্যোক্তা এবং পাটজাত পণ্যের ব্যবহারের বাড়ানো। মন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার পাটপণ্যের অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের লক্ষ্যে ‘পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন-২০১০’ বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। এই আইনের আওতায় ১৯টি পণ্যে পাটজাত মোড়কের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাট চাষ নিশ্চিতকরণে বীজ সরবরাহ সঠিক রাখার পাশাপাশি কৃষককে অন্যান্য উপকরণ সহায়তার কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাটের উৎপাদন বহুগুণে বেড়েছে।

পাট মৌসুমে হাট-বাজারে নজরদারি জোরদার করা, নিয়মবহির্ভূত মজুত ও বিদেশে কাঁচা পাট পাচার রোধে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। বিজেএমসির সাময়িক বন্ধকৃত মিলগুলো অবসায়নের পর সরকারের নিয়ন্ত্রণে রেখে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় লিজ দেওয়ার কাজ চলছে। ইতোমধ্যে নরসিংদীর বাংলাদেশ জুটমিল এবং চট্টগ্রামের কেএফডি জুট মিলস ভাড়াভিত্তিক ইজারার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আরও দুটি জুট মিলের লিজ দেওয়ার কাজ চলমান। অবশিষ্ট ১৩টি মিল লিজ দেওয়ার জন্য দ্বিতীয়বারের মতো ইওআই (এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট) আহ্বান করা হয়েছে। আশা করছি, দ্রুত আরও কিছু মিল চালু করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, এ বছর ১১টি ক্যাটাগরিতে ১১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কার দেবে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়।