নারীর স্বাধীন যুক্তিতে নারীর মুক্তি


sraboni প্রকাশিত: ৭:৫৩ অপরাহ্ণ ৩ মার্চ , ২০২২
নারীর স্বাধীন যুক্তিতে নারীর মুক্তি

শ্রাবণী খাতুন: এই লাল-সবুজের পতাকার জন্য যুদ্ধ করেছেন বাংলার অগণিত নারী-পুরুষ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, নয় মাসের ভয়ঙ্কর যুদ্ধে নারীর কথা উঠলেই, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই চোখের সামনে ভেসে উঠে ধর্ষিতা, নির্যাতিতা নারীর ছবি৷ কিন্তু নারী শুধু নির্যাতিতাই হননি, পুরুষের পাশাপাশি ঝাঁপিয়েও পড়েছিলেন স্বাধীনতা যুদ্ধে, অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন হাতে৷

কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছেন পুরুষের সাথে৷ মুক্তি যোদ্ধা বীর প্রতীক তারামন বিবির কথা তো সবারই জানা৷ ক’জন তারামন বিবির কথাই বা আমরা জানি? বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের নেপথ্যে এইরকম অসংখ্য তারামন বিবির অবদান লুকিয়ে আছে৷ বীর প্রতীক তারামন বিবি পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন কুড়িগ্রামের শঙ্কর মাধবপুর গ্রাম থেকে৷ তিনি ছিলেন ১১ নম্বর সেক্টরে৷ যুদ্ধ করেছেন, সেক্টর কমান্ডার আবু তাহের বীর উত্তমের নেতৃত্বে৷ ক্যাম্পে যখন যোগ দেন তারামন তখন তার বয়স ছিল ১৩/১৪ বছর৷

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন এই রকম আরেকজনের নাম শিরীন বানু ৷ তিনি যখন হাতে অস্ত্র তুলে নেন, তখন তাঁর বয়স ২১৷ জিজ্ঞেস করেছিলাম কীভাবে তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধে জড়িত হলেন? শিরীন জানান, ‘‘আমি মুক্তিযুদ্ধে জড়িত হলাম শুরু থেকেই৷ ২৫ শে মার্চ আমি তখন পাবনায় ছিলাম৷ পাক আর্মিরা পাবনা শহরে ঢোকে এবং কারফিউ জারি করে৷ তারা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং লোকজনের ওপরে অত্যাচার শুরু করে৷ এবং পুলিশ লাইনে তারা অস্ত্র সারেন্ডার করার জন্যে বলে, ঐ সময়ে জনপ্রতিরোধ তৈরি হয় পাবনায়৷ এবং আমি তখন জনগণের সাথে৷ টেলিফোন ভবনে যে যুদ্ধটা হয় আমি সেখানে যুদ্ধে যোগ দেই৷ আমার সাথে আমার দুই কাজিনও ছিল এবং আমি ছেলেদের মতো পোশাক পরেই ওখানে চলে গিয়েছিলাম, কারণ বাংলাদেশে মেয়েদের জন্যে সবসময় দৌড়াদোড়ির জায়গায় যাওয়াটা ঐ সময়ে একটু সমস্যা ছিল৷ ঐ যুদ্ধের পরে যেটা হয় যে, পাবনা ১০ দিন স্বাধীন ছিল৷ এবং পরবর্তী সময়ে আমাদের যুদ্ধ হয় নগরবাড়ি ঘাটে৷ এবং সেখান থেকে আমরা যখন পিছু হটতে বাধ্য হই, কুষ্টিয়াতে আসি৷ কুষ্টিয়াতে পাকশির যুদ্ধে ওখানেও আমরা ছিলাম৷ তারপরে আমরা চুয়াডাঙ্গাতে চলে আসি৷”
নয় মাসের স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলাদেশের নারীর অবদান রয়েছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে৷ যারা হাতে অস্ত্র তুলে নেননি, তারা করেছেন সেবা৷ ক্যাম্পে ক্যাম্পে ঘুরে মানুষের সেবা করেছেন৷ সেবা করেছেন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের৷ স্বাধীন বাংলা বেতার

সাংবিধানিক অবস্থান

বাংলাদেশের নারী জনগোষ্ঠী রাজনৈতিক সামাজিক, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনগ্রসর থাকায় বাংলাদেশের সংবিধানে তাদের অবস্থার উন্নতিকল্পে বিশেষ সুবিধা ও অধিকার সন্নিবেশিত হয়েছে। ১৯৭২ সালে প্রণীত প্রথম ও মূল সংবিধান এবং পরবর্তীতে কয়েকটি সংশোধনীতে তাদের বাড়তি সুযোগ সুবিধা ও সংরক্ষিত অধিকার দেওয়ার কথা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সংযোজন করা হয়েছে।সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে বর্ণনা করা হয়েছে রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি। এ অধ্যায়ের ১৫নং ধারার (ঘ) উপধারায় ঘোষিত হয়েছে যে, সমাজের দুঃস্থ মানুষের পাশাপাশি বিধবাদের সামাজিক নিরাপত্তা বিধানের জন্য সরকারি সাহায্য লাভের অধিকার সংরক্ষিত থাকবে। ১৭নং ধারার (ক) উপধারায় বলা হয়েছে, একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করা হবে এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সকল বালক এবং বালিকার জন্য অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদান ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ১৮ (২) ধারায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্র কর্তৃক পতিতা বৃত্তি বন্ধ করার জন্য যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া হবে। ১৯নং ধারার ১নং উপধারায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্র সকল নাগরিকের জন্য সমান সুযোগের নিশ্চয়তা দিবে এবং ২নং উপধারায় লিখিত হয়েছে, রাষ্ট্র মানুষে মানুষে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য বিলোপ করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

আইনগত মর্যাদা: 

দেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নারীরা কতটা সমতা ভোগ করছে আইন কাঠামো এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। নারীর অধিকার রক্ষাকারী আইনসমূহ নারীর অধিকার বাস্তবায়নের জন্য আনুষ্ঠানিক সমতার মৌলিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও চাকুরি ক্ষেত্রে নারীর অধিকার সুরক্ষায় আইন ন্যায়সঙ্গত হস্তক্ষেপ করতে পারে।বাংলাদেশে নারী-পুরুষ কর্তৃক ভোগকৃত মৌলিক অধিকারের মূল উৎস হলো গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান। জনগণের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা সম্পর্কে রয়েছে দুই ধরনের আইন: দেওয়ানি ও ব্যক্তিগত। দেওয়ানি আইন সংবিধান প্রদত্ত নারীর অধিকার এবং ব্যক্তি-আইন পারিবারিক জীবনে নারীর অধিকার রক্ষা করে।বাংলাদেশের সংবিধান রাষ্ট্রীয় ও জনজীবনে নারী ও পুরুষের সমানাধিকার ঘোষণা করে এবং তাতে রাষ্ট্রকে এই লক্ষ্যে ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণে নিদের্শনা দেয়। সংবিধানের ১৯ ধারা লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য সম্পূর্ণ বাতিল করে নারীর রাজনৈতিক সমঅধিকারের স্বীকৃতি দেয়।সংবিধানের ২৭ ধারা দ্ব্যর্থহীনভাবে উল্লেখ করে যে, সকল নাগরিক আইনের চোখে সমান এবং আইনের মাধ্যমে অভিন্ন সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী। ২৮ ধারা রাষ্ট্রকে ‘মহিলা বা শিশু অথবা সমাজের যেকোন পশ্চাদপদ অংশের উন্নয়নের জন্য’ বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের নিদের্শনা দিয়েছে। নারীদের বিরুদ্ধে সকল ধরনের বৈষম্যের বিলুপ্তি বিষয়ক জাতিসংঘ সনদ (UNCEDAW) অনুমোদনের মাধ্যমে সরকার এক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।

নারী নির্যাতন: 

বেইজিং-এ অনুষ্ঠিত চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলন ১৯৯৫ নারীর প্রতি সহিংসতাকে নারী-পুরুষ সম্পর্কে একটি অন্যতম সমস্যা বলে চিহ্নিত করেছে। উক্ত সম্মেলন মনে করে, পুরুষ কর্তৃক নারীর প্রতি সহিংসতামূলক আচরণ বিশ্বময়। তবে উন্নত বিশ্বের চেয়ে উন্নয়নশীল দেশসমূহে নারী নির্যাতনের মাত্রা অনেক বেশি।নারী নির্যাতন বলতে সাধারণত বলপূর্বক নারীর উপর শারীরিক, মানসিক অথবা লিঙ্গ নির্যাতনকে বুঝায়। এ সহিংসতা হতে পারে ব্যক্তিক, পারিবারিক বা দলীয়। নারী পুরুষের অসম সামাজিক অবস্থান ও অসম অধিকার সহিংসতার সূতিকাগৃহ। পুরুষতান্ত্রিক সভ্যতায় নারীর অধস্তনতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে বিভিন্ন আইন-কানুন, আচার-অনুষ্ঠান ও রীতিনীতির মাধ্যমে যা পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে নারী সহিংসতায় ব্যবহূত হয়। নারী হওয়ার কারণে গৃহে অন্তরীণ থাকা, বোরখা ব্যবহার করা, অসম উত্তরাধিকার ভোগ করা, পরিবার ও সমাজে অধস্তন ভূমিকা পালন করা এবং আরও অসংখ্য বৈষম্যমূলক আচরণ নারীর প্রতি এক ধরনের নীরব সহিংসতা। ঐ সহিংসতা থেকেই উদ্ভূত শারীরিক ও লিঙ্গীয় সহিংসতা।
বাংলাদেশে নারী নির্যাতন একটি বড় সমস্যা। এদেশে শতকরা ১৪ ভাগ মাতৃমৃত্যু ঘটে নারীর প্রতি সহিংসতার কারণে। এসিড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে অহরহ। সহিংসতায় গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি হবার ঘটনা নিত্যদিনকার। মানবাধিকার প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, নারীর প্রতি অপরাধ প্রবণতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।নারী নির্যাতনের প্রধান ক্ষেত্র হলো: (১) লিঙ্গ নির্যাতন, (২) ধর্ষণ, (৩) জখম ও হত্যা, (৪) মেয়ে শিশু/ভ্রূণ হত্যা, (৫) ফতোয়া, (৬) যৌতুক, বিয়ে বা তালাকের কারণে জখম ও হত্যা, (৭) ব্যভিচার, (৮) পতিতাবৃত্তি, ও (৯) নারীপাচার

সিভিল সার্ভিসে: 

নারী ব্রিটিশ শাসিত ভারতের (১৭৫৭-১৯৪৭) সরকারি চাকুরিতে নারীদের সংখ্যা সম্বন্ধে বিস্তারিত তথ্য নেই। তবু, এমন ধারণা করা যায় যে, ঐ সময়কালে প্রশাসনযন্ত্রে তাদের সংখ্যা ছিল নগণ্য। প্রকৃতপক্ষে প্রাথমিক বছরগুলিতে আইনগতভাবেই উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক পদে মহিলাদের প্রবেশে বাধা দেয়া হতো। প্রধানত চিকিৎসা সংক্রান্ত চাকুরিতে, ভারতীয় শিক্ষাবিভাগে, প্রাদেশিক শিক্ষা বিভাগে এবং ডাক ও তার বিভাগের পদসমূহে তাদের নিয়োগ করা হতো। স্বরাষ্ট্রবিভাগ, গোয়েন্দা ব্যুরো, অর্থ, নিরাপত্তা, মুদ্রণ, প্রতিরক্ষা, সশস্ত্র বাহিনী, ভারতীয় ভূতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ, বিস্ফোরক শাখা, শ্রম ও ভূমি, অল-ইন্ডিয়া রেডিও, সামরিক হিসাব শাখার নিম্নপর্যায়ের কারণিকের পদসমূহে এবং কেন্দ্রীয় রাজস্ব বোর্ডের বিবিধ পদে কাজ করার সুযোগ বা অনুমতিও তারা পেত।

ঊন্নয়নে নারী: 

উন্নয়ন অভিধানে একটি অতি আধুনিক সংযোজন এবং এমন একটি ধারণা যা বৈশ্বিক ও জাতীয় পর্যায়ে সামাজিক এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বা অবদানকে স্বীকৃতি দেয়। ঊন্নয়নে নারী বলতে বুঝায় যে নারীরা উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের সাথে জড়িত এবং উন্নয়নে তাদের অংশগ্রহণের পরিবেশ অনুকূল করা অত্যাবশ্যক। বাংলাদেশের নারীরা বরাবরই পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার সনাতনী ধ্যান-ধারণা ও মূল্যবোধ এবং লিঙ্গ বৈষম্যের শিকার। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চাকরি ও সুশাসনের প্রাতিষ্ঠানিক এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক বহু সুযোগ সুবিধা থেকে প্রায়শ তারা বঞ্চিত। নারীরা সন্তান ধারণ করে, সন্তান জন্ম দেয়, তাদের প্রতিপালন করে এবং সংসারের যাবতীয় কাজকর্ম করে, কিন্তু কখনো তারা নিজেদের কাজের জন্য যথোপযুক্ত মজুরি ও স্বীকৃতি পায় না। চাকরির ক্ষেত্রে কোনো প্রকার আইনি বা প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা নারীরা পায় না। গ্রা্রমীণ পর্যায়ে ৮৪% এবং শহরে ৫৯% নারী অবৈতনিক গৃহ পরিচালিকা হিসেবে কর্মরত থাকে। বাংলাদেশের নারীরা পুরুষের তুলনায় সপ্তাহে গড়ে ২১ ঘন্টা বেশি সময় কাজ করে। যদিও ঘর গৃহস্থালীর কাজে যুক্ত নারীশ্রমকে অর্থনৈতিক মানদন্ডে কর্মকান্ড হিসেবে ধরা হয়েছে, কিন্তু এর অর্থমূল্য এখন পর্যন্ত জাতীয় আয় গণনায় হিসাব করা হয় না।

শিল্প ও ব্যবসায়িক উদ্যোগে নারী:

বাংলাদেশে শ্রমশক্তি খাতে নারীদের অংশগ্রহণ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু সাধারণভাবে তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ খুব সীমিত। বাংলাদেশ সরকার ও এনজিওসমূহ দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির জন্য নানারকম কর্মসূচি নিয়েছে। দারিদ্র্য বিমোচনের একটি উপায় হচ্ছে নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, বিশেষ করে এমন সব প্রকল্পের মাধ্যমে যেগুলি নারীদের শিল্পোদ্যোগের মাধ্যমে আয় সৃষ্টির কাজে নিয়োজিত রাখে।

ঐতিহাসিকভাবে, উন্নত ও উন্নয়শীল সব দেশেই শিল্প ও ব্যবসায়িক উদ্যোগে নারীর চেয়ে পুরুষের সংখ্যা অনেক বেশি। বাংলাদেশেও নারীরা এখনও শিল্প ও ব্যবসায়িক উদ্যোগের মূল ধারায় আসে নি। শুধু ক্ষুদ্র শিল্প ও ব্যবসায়িক উদ্যোগে নারীর কিছু উপস্থিতি রয়েছে, অন্যত্র তাদের উপস্থিতি একেবারেই নগণ্য। অধিকাংশ নারী উদ্যোক্তাই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, তারা প্রধানত গ্রামাঞ্চলের বাজারে কেন্দ্রীভূত অনানুষ্ঠানিক শিল্প খাতে কাজ করেন। তবে তৈরি পোশাক শিল্পের মতো পরিকল্পিত ও সংগঠিত শিল্প খাতেও স্বল্প কিছুসংখ্যক নারী উদ্যোক্তার উপস্থিতি নজরে পড়ে।

সাংবাদিকতায় নারী:

বাঙালি নারীদের সাংবাদিকতায় আগমন ঘটে সাময়িকী সম্পাদনার মাধ্যমে। প্রথম সাময়িকী পাক্ষিক বঙ্গমহিলা সম্পাদনা করেছিলেন একজন মহিলা। মোক্ষমদায়িনী মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় এটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৭০ সালের ১৪ এপ্রিল। প্রথম মাসিক জেন্ডার ভিত্তিক ম্যাগাজিন অনাথিনী মহিলাদের দ্বারা পরিচালিত ও প্রকাশিত হয় ১৮৭৫ সালের জুলাই মাসে। মহিলা কর্তৃক সম্পদিত প্রথম সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন বঙ্গবাসিনী প্রকাশিত হয় ১৮৮৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর। মুসলিম নারী বেগম সুফিয়া খাতুন কর্তৃক সম্পাদিত প্রথম মাসিক ম্যাগাজিন অন্বেষা সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় ১৩২৮ সনের বৈশাখ মাসে (১৯২১ খ্রি)। একজন মহিলা কর্তৃক সম্পাদিত পাপিয়া নামক ত্রৈমাসিক ম্যাগাজিন প্রথম প্রকাশিত হয় ঢাকা থেকে। ম্যাগাজিনটি সম্পাদনা করেন বিভাবতী সেন। এ সচিত্র সাময়িকীটি শিশুদের উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা হয়। বেগম শামসুন্নাহার এবং মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ বাহার সম্পাদিত বুলবুল প্রকাশিত হয় বছরে তিন সংখ্যা।

রাজনীতিতে নারী: 

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর অবস্থানের অগ্রগতি হয়েছে চারটি পৃথক স্তরে: (১) নেতৃত্বের পর্যায়, (২) কোটা পদ্ধতি, (৩) নির্বাচনী রাজনীতি এবং (৪) নারী আন্দোলন।দেশের রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণের ধরন ও সুযোগ সম্পর্কে ১৯৭২ সালের সংবিধানে উল্লেখ রয়েছে। ২৯ নং অনুচ্ছেদে সুনির্দিষ্টভাবে উভয় লিঙ্গের ক্ষেত্রে সম অধিকার নিশ্চিত করে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের কোন দফতরে চাকুরির ক্ষেত্রে নাগরিকদের মধ্যে নারী পুরুষের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার বৈষম্য সৃষ্টি করা যাবে না। এ ঘোষণার উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিতে নারীদের উৎসাহিত করা এবং নারীর সম্ভাবনাময় নেতৃত্বের যোগ্যতা বৃদ্ধি। বাংলাদেশে বিদ্যমান আর্থসামজিক অবস্থার আলোকে জাতীয় সংসদে মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসন সৃষ্টির লক্ষ্যে সংবিধানে জাতীয় সংসদকে ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। নির্বাচিত সদস্যদের ভোটে সংসদে মহিলা সদস্য নির্বাচিত করার বিধান রাখা হয়।

সাহিত্য-সংস্কৃতিতে নারী:

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষদিক থেকে বাংলা সাহিত্যে নারীর ধারাবাহিক অবদান লক্ষ করা যায়। সাহিত্যিক উৎকর্ষ এবং স্বকীয়তার দিক দিয়ে তাঁদের রচনাবলি বিশিষ্ট। নারীর প্রতি সামাজিক বৈষম্য এবং পুরুষের স্বেচ্ছাচারিতা নারীকে তাঁর আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে প্রবৃত্ত করেছে। প্রথমদিকে সাহিত্যে বিদ্রোহের চেয়ে করুণ রসের আধিক্য লক্ষ করা গেলেও পরবর্তীতে তা আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রয়াসে পর্যবসিত হয়। আলোচনার সংক্ষিপ্ত পরিসরে সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখায় উল্লেখযোগ্য নারী সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের অবদানকে মূল্যায়নের চেষ্টা করা হয়েছে।

সাহিত্য স্বর্ণকুমারী দেবীর (আনু. ১৮৫৫-১৯৩২) উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ গাথা (১৮৮০), কবিতা ও গান (১৮৯৫)। সাশ্রুসম্পাদন, সাধের ভাসান, খড়গ-পরিণয়, অভাগিনী-এ চারটি অধ্যায়ের সমষ্টি তাঁর গাথা কাব্যটি। খড়গ-পরিণয় অধ্যায়টি ঐতিহাসিক কাহিনী অবলম্বনে রচিত। মানকুমারী বসুর (১৮৬৩-১৯৪৩) সর্বোৎকৃষ্ট গ্রন্থ কাব্য-কুসুমাঞ্জলি (১৮৮৪)। তাঁর কবিতা সামাজিক, প্রাকৃতিক, স্বাদেশিকতামূলক, সমসাময়িক ঘটনা বিষয়ক, পৌরাণিক এবং শিশুবিষয়ক। কামিনী রায়ের (১৮৬৪-১৯৩৩) কবিতার প্রধান লক্ষণ ভাবের জটিলতা, অস্পষ্টতা ও ছন্দের আড়ষ্টতাবিহীন ভাবসম্পদে পূর্ণ এবং সম্পূর্ণ অনুকরণমুক্ত। এ পর্যায়ে তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: আলো ও ছায়া (১৮৮৯), পৌরাণিকী (১৮৯৭), দীপ ও ধূপ (১৯২৯), নির্ম্মাল্য (১৮৯১), অশোক-সঙ্গীত (সনেটগুচ্ছ, ১৯১৪), জীবন-পথে (সনেটগুচ্ছ, ১৯৩০) প্রভৃতি। সরলাবালা সরকার (১৮৭৫-১৯৬১) বৈষ্ণবভাবাপন্ন কবি। তাঁর প্রবাহ (১৯০৪) ও অর্ঘ্য (১৯৫১) কাব্যদ্বয় ছন্দমাধুর্যে, শব্দসম্পদ ও স্বদেশানুরাগে সার্থকমন্ডিত হয়েছে। উমা দেবীর (১৯০৪-১৯৩১) কবি প্রতিভার উৎকৃষ্ট নিদর্শন চল্লিশটি চতুর্দ্দশপদী কবিতা সন্নিবিষ্ট বাতায়ন কাব্যগ্রন্থ। দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সহজসরল চিত্রটি তাঁর কবিতাকে আশ্রয় করে আছে। মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকার (১৯১০-১৯৮৩) উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে পসারিণী (১৯৩১), মন ও মৃত্তিকা (১৯৬০), অরণ্যের সুর (১৯৬৬)। সুফিয়া কামাল (১৯১১-১৯৯৯) কবি, সংগঠক। স্বৈরাচার, ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তিনি বরাবর সোচ্চার ছিলেন। সমাজ, ভাষা ও সংস্কৃতি তাঁর মূূূূল প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: সাঁঝের মায়া (১৯৩৮), মায়া কাজল (১৯৫১), মন ও জীবন (১৯৫৭), উদাত্ত পৃথিবী (১৯৬৪), প্রশান্তি ও প্রার্থনা, দিওয়ানা, স্বনির্বাচিত কবিতা সংকলন প্রভৃতি। তাঁর কবিতার বিষয় প্রেম, প্রকৃতি ব্যক্তিগত অনুভুতি, বেদনাময় স্মৃতি, জাতীয় উৎসবাদি, স্বদেশানুরাগ, স্বাধীনতাযুদ্ধ ও ধর্মানুভূতি। তাঁর কবিতায় রয়েছে অন্তরঙ্গ আবেগ ও ভাষাভঙ্গির সহজ আবেদন।

নারী আন্দোলন নারীর অধিকার: 

নারী পুরুষের সমমর্যাদার প্রতি বিশ্বাস এবং পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে নারীর অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পরিচালিত কর্মকান্ড। নারী আন্দোলনের লক্ষ্য ও কার্যক্রম দেশ, শ্রেণী, জাতি এবং সংস্কৃতি ভেদে ভিন্নতর। ভারত উপমহাদেশে বিশেষত অবিভক্ত বাংলায় নারী আন্দোলন শুরু এবং পরিচালিত হয় সংস্কারবাদী আন্দোলন এবং আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে। সমাজ সংস্কার আন্দোলনের প্রগতিশীল নেতা রাজা রামমোহন রায় (১৭৭৪-১৮৩৩), ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-১৮৯১), ব্রিটিশ পন্ডিত ডিরোজিও, ব্রাহ্মসমাজ নেতৃবৃন্দ এবং অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি নারীদের সামাজিক ও ধর্মীয় নির্যাতন থেকে রক্ষার জন্য ব্যাপক আন্দোলন শুরু করেন। তৎকালীন সময়ে তাঁরা বৈপ্লবিক পরিবেশ সৃষ্টি করেন এবং মানুষের মনমানসে নারী পুরুষের সমতা বিষয়ে ইতিবাচক ধারণার সৃষ্টি করেন। নারী আন্দোলনের সূচনা পুরুষের মাধ্যমে হলেও পরবর্তী সময়ে নারীরাও এতে অন্তর্ভুক্ত হন। বিশ শতকের শেষদিকে এসে নারীর অবস্থানের পরিবর্তন হয়েছে এবং তা সম্ভব হয়েছে বৃহত্তর নারী আন্দোলনের প্রভাবে।

অবিভক্ত ভারতে নারী আন্দোলন: মুক্তি ও আত্মসচেতনতার যুগ উনিশ শতকে নারী আন্দোলন শুরু হয় রাজা রামমোহন রায়ের প্রচেষ্টায় সমাজ সংস্কারের অংশ হিসেবে এবং সতীদাহ প্রথা বিলোপের জন্য প্রচারণা ও কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে। ১৮১৫ সালে রামমোহন রায় আত্মীয় সভা প্রতিষ্ঠা করেন নারীদের প্রতি সামাজিক ও ধর্মীয় নিপীড়ন বন্ধের জন্য। ১৮২৮ সালে রামমোহন রায় প্রগতিশীল ব্রাহ্মদের সহযোগিতায় সতীদাহ বন্ধের জন্য ব্রাহ্ম সভা প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি সতীদাহ বিষয়ে কয়েকটি বই লেখেন, যেমন সহমরণ বিষয়ে প্রবর্তক এবং নিবর্তকের সংবাদ: প্রথম প্রস্তাব (১৮১৮) ও দ্বিতীয় প্রস্তাব (১৮১৯) এবং সহমরণ (১৮২৯)। সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে অব্যাহত আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ১৮১৫ এবং ১৮১৭ সালে সহমরণ বিষয়ে শিথিলতা আরোপ করা হয়। ১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বর লর্ড উইলিয়ম বেন্টিঙ্ক সতীদাহ বিলোপে আইন প্রণয়ন করেন। রামমোহন রায় বর্ণবৈষম্য, বহুবিবাহ এবং বাল্য বিবাহের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন। তাঁর মতে নারীর প্রতি নিপীড়ন বিদ্যমান সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় আচরণ ব্যবস্থার বহিঃপ্রকাশ। তিনি বাঙালি নারীদের নিজস্ব সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ পশ্চিমা সংস্কৃতির উৎকৃষ্ট দিক গ্রহণ করার প্রতি জোর দেন।