নিঃসঙ্গ বচন


sujon প্রকাশিত: ৫:৩০ অপরাহ্ণ ২৮ ফেব্রুয়ারি , ২০২২
নিঃসঙ্গ বচন

সুলেখা আক্তার শান্তা : আনিকা খুব আত্মনির্ভরশীল আর কর্মঠ মেয়ে। পড়ালেখার পাশাপাশি ছোট্ট একটি শোরুম চালায় সে।

সংসারে আছে একমাত্র মা। বাবা তিন বছরের আনিকাকে মায়ের কোলে ফেলে চলে যায়।

আর কখনো বাবার মুখ দেখা হয়নি আনিকার।

বাবা বেঁচে আছে কি নেই তাও জানা নাই। সে সবকিছু আপন উদ্যোগে করে।

কোন কিছু তাকে বলে করে করতে হয় না। আনিকার কলেজে বনভোজন অনুষ্ঠান।

বনভোজন অনুষ্ঠানের আয়োজনে সহপাঠী সবাই উল্লসিত। অধির আগ্রহে অপেক্ষা করে বনভোজনের দিনটির জন্য। বনভোজনের চাঁদা একে একে সবাই পরিশোধ করে কিন্তু আকাশের টাকা দেওয়া হয় না। এজন্য আকাশ কারো সামনেও আসে না। ভীষণ মন খারাপ করে কলেজের ক্লাস রুমের পাশে একটি গাছের নিচে আকাশ বসে থাকে।

আনিকা কলেজের বারান্দা থেকে তা দেখে। আকাশের কাছে  গিয়ে আনিকা জিজ্ঞেস করে, এখানে বসে আছো কেন?

আকাশ কোনো কথা বলে না।

তোমার কি শরীর খারাপ? আনিকার দিকে তাকিয়ে আকাশ মাথা নেড়ে না বলে।

ক্লাস শুরু হবে, ক্লাসে আসো।

না, তুমি যাও।

ক্লাসের কিছু সহপাঠী আকাশের কাছে এসে বলে, তুমি এখানে বসে আছো।

পিকনিকের চাঁদা সবাই দিয়েছে শুধু তোমারটা দেওয়া হয়নি। সবার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে আকাশ কোন কথা বলে না। অসহায় অভিব্যক্তি ফুটে ওঠে আকাশের মুখে। সেটা লক্ষ্য করে আনিকা। আনিকা বলে, পিকনিকে যাবে না তুমি?

চোখের টলমল অশ্রু নিয়ে আকাশের বেদনা ভরা উত্তর, গরিবদের হয়না কোন স্বাদ-আহ্লাদ পূরণ।

আকাশ তোমার বনভোজনের টাকা আমি দেবো।

না।

আমি তোমার বন্ধু হয়ে বন্ধুর জন্য এটুকু করতে পারিনা। আকাশের বনভোজনের টাকা আনিকা দেয়। আকাশ বনভোজনে যায়। আনিকার নিরব পর্যবেক্ষণে থাকে আকাশ। আকাশের সব সংকটে আনিকা পাশে দাঁড়ায়। হঠাৎ আকাশ কলেজ আসা বন্ধ করে দেয়। বেশ কদিন আকাশকে কলেজে দেখতে না পেয়ে আনিকা উদ্বিগ্ন হয়।

চিন্তায় পড়ে, আকাশ কেন কলেজে আসে না! আনিকা আকাশের সম্মুখীন হয়।

আকাশ কেন তুমি কলেজে আসো না?

আমি আর কলেজে যাব না। সমস্যা তাই। কলেজের বেতন জমে আছে। আর পোশাক-আশাকের যে শ্রী। মুখ গম্ভীর করে বলে, হবে না আর আমার পড়ালেখা।

আকাশ তুমি আমার বন্ধু, আমি তোমার পাশে দাঁড়াতে চাই। বন্ধুত্ব সার্থক হবে বন্ধুর প্রয়োজনে কাজে লাগতে পারলে।

তুমি আমার জন্য করবে কেন? আর করলেই তা গ্রহণ করতে পারিনা।

আমার একেবারে খারাপ অবস্থা না। আমার একটি ব্যবসা আছে, সেখান থেকে আমার মোটামুটি ভালো উপার্জন হয়। আমি আজ থেকে তোমার পড়ালেখার দায়িত্ব নিলাম, তুমি পড়ালেখা বন্ধ করো না। আকাশের কলেজ ফি আনিকা দিয়ে দেয়।

আনিকা চায় নিজের সামর্থ্য ব্যবহার করে কাউকে প্রতিষ্ঠিত করার সার্থকতা।

সংকট সমাধান হওয়ায় আকাশের ফুরফুরে মেজাজ। আনিকা তার যাবতীয় খরচ বহন করতে থাকে। আনিকা সংগ্রামী মেয়ে সে জীবনের সকল বাধা অতিক্রম করে চলে। এ বয়সেই সে নিজের খরচ চালিয়ে অপরের খরচ বহন করার সামর্থ্য অর্জন করেছে। সংকট সমাধান খুব সহজ ব্যাপার নয়। আনিকা সংগ্রামে সংকট অতিক্রমের কথা কাউকে বুঝতে দেয় না। সহজ সচ্ছন্দে সবকিছু চলছে, নিজেকে সবার সামনে এভাবে উপস্থাপন করে। জীবনে তার কোন বাধা নেই, সংগ্রাম নেই, সবকিছুই যেন সে সহজ ভাবে করে চলছে। আকাশ সবকিছু দেখে মুগ্ধ হয়।

নিজের পড়ালেখার খরচ, ব্যবসা, সংসার খরচ, সবকিছুই আনিকা উপর। আনিকা আর আকাশ উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে ডিগ্রিতে ভর্তি হয়। চলতে থাকে দিন।

রাহেলার বয়স হয়েছে। মেয়েটার জন্য চিন্তা হয়। মেয়ের বিয়ে দিতে চায়।

আনিকাকে বলে, মা আমি তোর বিয়ে দিতে চাই।

আমি এখন বিয়ে করতে চাই না মা। আমার পড়ালেখা, ব্যবসা, তারপর তোমাকে দেখবে কে?

পড়ালেখা তোর যত ইচ্ছা কর, কিন্তু বিয়ে করেও তুই পড়ালেখা করতে পারবি।

তেমন ছেলে দেখেই আমি তোর দিয়ে দিব। তুই একাই কর্তব্য পালন করে যাবি। মা হিসাবে আমারও তো কর্তব্য আছে সন্তানের প্রতি।

মা তোমার যা ভালো মনে হয় তুমি তাই করো।

মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে রাহেলা ঘটক আব্বাসের সঙ্গে কথা বলে।

আব্বাস বলে, মাশাল্লাহ আপনার মেয়েটা অনেক সুন্দর। আনিকা মাকে বিয়ে দেওয়া আমার জন্য কোন ব্যাপারই না। আব্বাস ঘটক পাত্র ঠিক করে নিয়ে আসে। পাত্র আবির আনিকাকে দেখে পছন্দ করে। আনিকারও আবিরকে পছন্দ করে। পাত্র-পাত্রী দু’জনকে দু’জনার পছন্দ হয়। বিয়ের দিন তারিখও ঠিক হয়। বিয়ের সব আয়োজনও ঠিক হয়ে যায়। বিয়ের একদিন আগে আকাশ আনিকাকে বলে, আনিকা আমি তোমার কাছে একটি দাবি নিয়ে দাঁড়াতে চাই।

বলো আকাশ কি দাবি। আর তুমি আমার কাছে দাবি কথা বলছ কেন? তুমি আমার বন্ধু তুমি আমাকে বলে দেখো না তা তুমি আমার কাছে পাও কিনা।

আমি তোমাকে চাই!

আনিকা হাসি দিয়ে বলে, কি বলছো তুমি?

আমাকে ফিরিয়ে দিওনা তুমি!

আমার বিয়ে ঠিক হয়ে আছে।

এবিয়ে তুমি বন্ধ করে দাও।

আকাশ এটা সম্ভব না।

কেন সম্ভব না! আমি তোমাকে ভালোবাসি।

তুমিতো এ কথা আগে কখনো আমাকে বলনি।

হ্যাঁ আমি বলিনি ভুল করেছি। আমার অন্তরে আছো যে তুমি। সেখান থেকে কখনোই তোমাকে সরানো যাবে না। আনিকা সমাধান তোমার হাতে।

আকাশ এসব চিন্তা মাথা থেকে বাদ দাও। কাল আমার বিয়ে। এখানে মান-সম্মান অনেক কিছু জড়িত।

আনিকা তুমি আমার জন্য কি না করেছো। আমার পড়ালেখা, আমার পোশাক-আশাক আমার খাওয়া-দাওয়া, আমার ভালো থাকা, সবকিছুতেই জড়িয়ে আছো তুমি। আমি যে তোমার প্রতি নির্ভরশীল হয়ে গেছি সব কিছুতেই। তোমাকে ছাড়া আমার জীবন চালবে কি করে! আকাশ তুমি এভাবে বলোনা। আমার তোমার জন্য খারাপ লাগছে। আকাশ বলতে থাকে, বড় অসহায়, একা লাগছে নিজেকে। মনে হয় আমার হৃদপিণ্ড কেউ চেপে ধরেছে, আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে।

আকাশ বন্ধ করো এসব বলা। আকাশ, আকাশের মতো বিশাল করো তোমার হৃদয়। দেখবে তখন তোমার কোন কিছুতে খারাপ লাগবে না।

উপমা দিচ্ছো তুমি? আমার হৃদয় এখন যে ভরবে না কোনো উপমায়।

আজ অনিকার বিয়ের দিন। বিয়ের স্টেজে আনিকার পাশে গিয়ে আকাশ বলে, আনিকা আমার কথাগুলো শোনো। তুমি আমার হলে না। আমার হৃদয়ে ঝড় বইছে।

সেই ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে যাচ্ছে আমার হৃদয়। আকাশ তুমি এমন করছ কেন?

এসব পাগলামি ছাড়া আর কিছুই না। এমন কিছু করো না যা দেখে মানুষ তাজ্জব হয়।

আমি কিছু করবো না, কিছু কিছু মানুষ এমন করে তা আমি করবো না। আমি মাথা ফাটিয়ে রক্ত বের করে তোমাকে বলবো না ভালোবাসি। তেমন আমি করবো না।

আমি হাত কেটে রক্ত বের করে তোমাকে বলবো ভালোবাসি তা আমি করবো না।

জীবন শেষ করে বলবো আমি ভালোবাসি তাও আমি করবো না। কারণ সেগুলো তো বাহিরে দেখানো যায়। কিন্তু আমার হৃদয়ের রক্তক্ষরণ, আমি সে যন্ত্রনা ঢাকি কি করে?

আকাশ তুমি এবার থাম, আমি সইতে পারিনা।

আনিকা তুমি ছাড়া একা পৃথিবীতে থাকবো কি করে। কে করবে আমার জন্য চিন্তা।

তোমার মতো করে কে আমাকে আপন ভাববে।

এভাবে একান্তে কথা বলা অনেকের চোখে পড়ছে। আনিকা বলে, চারিদিকে কেমন

সব লোকজন তাকিয়ে আছে, দেখতে পাচ্ছো তুমি?

থামিয়ে দিতে চাও আমাকে, থেমে যাবো আমি। কিন্তু আমার হৃদয়ের আগুন তো কেউ থামাতে পারবে না।

বর বেশে আবির বসে আছে মুখে রুমাল দিয়ে। আলো ঝলমল করছে আবিরের মুখ।

তাকে দেখতে বেশ ভালো লাগছে। আকাশও দেখতে সুদর্শন কিন্তু সেই ঝলমল আকাশ ঢেকে গেছে হতাশার কালো মেঘে। আকাশের দুর্ভাগ্য পাওয়া হলো না আনিকাকে। অশ্রু রুদ্ধ চোখে আকাশ তাকিয়ে থাকে আবিরের দিকে। তুমি সৌভাগ্য নিয়ে পৃথিবীতে এসেছো। পৃথিবীর ভাগ্যহত ওদের মধ্যে আমি একজন।

আনিকাকে নিয়ে যায় আবিরের বাড়ি। আনিকা আর আবির পূর্ব পরিচিত না হলেও বৈবাহিক বন্ধন সমঝোতা তৈরি করেছে তাদের মধ্যে। দু’জন একে অপরকে বুঝে খুব ভালো। তারমধ্যও আকাশের অশ্রুসজল চোখ মায়া ভরা মুখ ভেসে ওঠে আনিকার মানসপটে। উদাসী হয় মন, ব্যাথা জাগে মনে। আকাশের জন্য খারাপ লাগে আনিকার।

আনিকা স্বামী আবিরকে নিয়ে মায়ের বাড়ি আসে। আনিকা মায়ের কাছে জানতে চায় আকাশ কোথায়?

রাহেলা বলেন, ছেলেটা তোর বিয়ের পর থেকে আর এ বাড়িতে আসেনা। ছেলেটা কোথায় গেছে বুঝলাম না।

আনিকা দেখে তার পড়ার টেবিলে একটি চিঠি। আনিকা খুলে পড়ে।

আনিকা তোমার সঙ্গে আর আমার দেখা হবে কিনা জানিনা। তবে আমি চাইনা তোমার সঙ্গে আর আমার দেখা হোক। তোমাকে যতটা দেখেছি সেই স্মৃতি নিয়ে আমি বেঁচে থাকতে চাই। আনিকা তুমি ছাড়া ব্যথায় ভরা হৃদয় আমার শূন্য হয়ে গেছে। জীবনের সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেছে।

অন্ধকার এ পথ কোনদিন আলোকিত হবে না। আমার জীবন তো হতাশার বালুচরে অনেক আগেই হের হারিয়ে যেত। পথ চলতে আলো পথ দেখালে তুমি। সেই আলো যে নিভিয়ে যাচ্ছে, জীবন চলায় কেন আমি পরাজিত। এই পৃথিবীতে তুমি ছাড়া সবকিছুই মলিন। পারবোনা তুমি ছাড়া পথ চলতে এই আলোর পৃথিবীতে। নিঃস্ব জীবনে নিঃস্ব হয়ে রইলাম আমি।

আনিকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। আকাশের জন্য আনিকা হৃদয়ে ব্যথা অনুভব করে।

সাহিত্য বিভাগের আরো খবর

আরও খবর