‘প্রতিটি পদক্ষেপই জীবন যাত্রার অংশ’, নাজমুল হুদা


sujon প্রকাশিত: ৫:০৮ অপরাহ্ণ ৭ মার্চ , ২০২২
‘প্রতিটি পদক্ষেপই জীবন যাত্রার অংশ’, নাজমুল হুদা

‘ইতিহাস প্রতিদিন’ এর এ পর্বের আলাপচারিতায় কথা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের উপপরিচালক, লেখক, গবেষক নাজমুল হুদার সাথে।

নাজমুল হুদা এক যুগের বেশি সময় সৃজনশীল লেখালেখি, সংগঠন ও সম্পাদনায় সক্রিয়। ছাত্রাবস্থায় অংশ নিয়েছেন জাতীয় টেলিভিশন বিতর্ক ও মুক্ত আলোচনায়। যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশ বেতারের অনুষ্ঠান বিভাগেও। ফার্মেসি ডিসিপ্লিন থেকে উচ্চশিক্ষার পাঠ চুকিয়ে শীর্ষস্থানীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকে উপপরিচালক হিসেবে কর্মরত। দেশে বিদেশে পেশাগত প্রশিক্ষণ গ্রহণ ছাড়াও তিনি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ‘উন্নয়ন অধ্যয়ন’ বিভাগ হতে স্নাতকত্তোর ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনুপ্রেরণামূলক বক্তৃতা, জাতীয় দৈনিকে নিয়মিত লেখালেখিসহ নানা সামাজিক সাংগাঠনিক কাজে সম্পৃক্ত আছেন। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত তাঁর প্রথম বই ‘ক্যারিয়ার ক্যারিশমা-সাফল্যের সাতপাঠ’ তুমুল পাঠকপ্রিয়তা পায়। এক্স ফ্যাক্টর, দ্য আইকন, বিতর্কে হাতেখড়ি’ ‘বিশ্বনন্দিত বাংলাদেশি বিজ্ঞানী’ ও আপন আয়নায় গোপন মুখ’ তাঁর উল্লেযোগ্য রচনা এবং ‘আমার বিজয়ের গল্প’ ও ‘আমার বঙ্গবন্ধু’ সম্পাদিত গ্রন্থ’।

আব্দুর রব: এ সময়ের ব্যস্ততা সম্পর্কে জানতে চাই।

নাজমুল হুদা: বিশেষ কোন ব্যস্ততা নেই। পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সব সময়ের মত এখনো টুকটাক লেখালেখি, পড়াশোনা ও সাংগাঠনিক কাজে কিছুটা সময় দিচ্ছি। তবে চলমান বইমেলাকে ঘিরে নি:সন্দেহে আলাদা একটা অনুভূতি, উৎসাহ ও উৎসব ভাব কাজ করছে। সুযোগ পেলেই বইমেলায় যাই-ঘুরে ঘুরে বই দেখি, বই কিনি। পরিচিত অনেকের সাথে দেখা হয়; অপরিচিত অনেকের সাথে আলাপ হয়-এইতো। বইমেলা প্রসঙ্গে কবি ওমর কায়সারের কবিতার কয়েকটি লাইন মনে পড়ছে:
‘রূপকথাময় রঙিন মলাট কোন বইটি বাঁচতে শেখায়
পরীর মায়ার ঘোরের ভেতর কোন গল্প স্বপ্ন দেখায়?
সারি সারি সাজিয়ে রাখা পাতায় পাতায় বর্ণমালায়
অনেক কথা বারুদ হয়ে বুকের ভেতর আগুন জ্বালায়।’

আব্দুর রব: এবারে মেলায় নতুন কি কি বই পাঠককে উপহার দিচ্ছেন?

নাজমুল হুদা: নতুন বই বলতে যা বোঝানো হয়, এখন পর্যন্ত সেরকম কোন বই আসেনি। আশা করি মেলার শেষ সপ্তাহ নাগাদ ‘জিনিয়াস জিসান-গল্পে গল্পে বিজ্ঞান’ নামে একটা বই আসবে কথাপ্রকাশ থেকে। কিছুদিন আগেই মুজিব শতবর্ষে দুই প্রজন্মের শত লেখা নিয়ে ‘আমার বঙ্গবন্ধু-প্রেম ও প্রেরণায়’ নামে আমার সম্পাদিত একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছে বাঙালি। ‘বিতর্কে হাতেখড়ি’ বইটার নতুন সংস্করণ আনার কথা চমন প্রকাশের। অন্যান্য আগের বইগুলো পাওয়া যাচ্ছে আলোঘর প্রকাশনার স্টলে।

আব্দুর রব: প্রকাশিতব্য বইটার বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাই।

নাজমুল হুদা: ‘জিনিয়াস জিসান’ মূলত এক বুদ্ধিদীপ্ত অনুসন্ধিৎসু বালকের গল্প। সে ডানপিটে না হলেও চটপটে, সবজান্তা না হলেও সবকিছুতে প্রবল আগ্রহী। তার মাথায় আশ্চর্যবোধক ও প্রশ্নবোধক চিহ্ন ঘুরপাক খায়। নতুন কিছু পেলে অতি উৎসাহী হয়ে সানন্দে কাজে লেগে পড়ে। তার সদাসঙ্গী বন্ধু সিয়াম, রাহেল ও ছোটবোন জিনিয়া। তাদের প্রতিদিনের পর্যবেক্ষণ, নানা প্রশ্ন আর যুক্তি-জিজ্ঞাসার জট খুলতে প্রায়ই ছুটে আসেন ছোট মামা ওরফে ‘হক মামা’। এভাবে বিজ্ঞানময়তার মধ্য দিয়ে বৈজ্ঞানিক রসদ নিয়ে গল্পে গল্পে মন থেকে বিজ্ঞান ভীতি তাড়াতে ও বিজ্ঞান প্রীতি বাড়াতে এই বইটি সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে আমার বিশ্বাস।

আব্দুর রব: বলা হয় অনুপ্রেরণামূলক উদ্যোগে আপনি ক্লান্তিহীন। সাম্প্রতিক উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে চাই।

নাজমুল হুদা: তরুণ শিক্ষার্থীদের উন্নত, দক্ষ আধুনিক মনের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বিজ্ঞান, বিতর্ক ও অনুপ্রেরণামূলক লেখালেখি ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে সৃজনশীল নানা উদ্যোগ গ্রহণের চেষ্টা করেছি। সারাদেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিতর্ক উৎসব কিংবা ক্যারিয়ার বিষয়ক আয়োজনগুলোতে ছুটে গিয়েছি। তরুণদের সামনে কথা বলে নিজেও উৎসাহ পেয়েছি, প্রাণিত হয়েছি। দৈনিক প্রথম আলোর শুক্রবারের চাকরি বাকরি পাতায় অনেকদিন ধরে নিয়মিত পরামর্শমূলক লেখা প্রকাশিত হচ্ছে। সাংগাঠনিকভাবে ন্যাশনাল ডিবেট ফেডারেশন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ইয়ুথ অরগানাইজেশন ফর স্কিল ডেভেলপমেন্ট, ক্যারিয়ার কেয়ার.কম বা স্বপ্নীলন এর সাথে সম্পৃক্ত থেকে নানাভাবে তরুণদের পাশে থেকে তাদেরকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছি

আব্দুর রব: ‘তুই ফেলে এসেছিস কারে মন, মনরে আমার’ আমরা জানি, রবী ঠাকুরের মত ফেলে আসা স্মৃতি আপনাকে তাড়িয়ে বেড়াই। এজন্যই কি এলাকার উন্নয়নের স্বপ্নে এত বিভোর থাকেন?

নাজমুল হুদা: আমার নিজের গ্রামের বিদ্যাপীঠ শৈশব কৈশরের স্মৃতিমেদুর আজমপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আমার মায়ের নামে শাহনুর খাতুন মডেল লাইর্রেরি প্রতিষ্ঠা করেছি। ‘পড়ি বই, আলোকিত হয়’ স্লোগানে প্রতিষ্ঠিত দৃষ্টিনন্দন আধুনিক মানের এই পাঠাগারের উদ্বোধন হলো কিছুদিন আগেই। দ্ইু যুগ আগে আমরা যখন এই স্কুলে পড়াশোনা করতাম তখন লাইব্রেরিতো দূরের কথা, বই রাখার জন্য এখানে কোন ¬তাক পর্যন্ত ছিলনা। এখন এই ক্ষুদ্র উদ্যোগের মাধ্যমে যদি নতুন প্রজন্ম বইপাঠে কিছুটা হলে আগ্রহী হয়ে উঠবে বলে আমার বিশ্বাস। এছাড়া এলাকার ভাল দিকগুলো তুলে ধরার পাশাপাশি নানা আপদে পাশে থাকার প্রত্যয়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সুধীসমাজের সমন্বয়ে ‘আলোকিত আমলা’ নামে একটা প্ল্যাটফর্ম দাড় করিয়েছি। করোনার কঠিন সময়ে ’আলোকিত আমলা’ র সদস্যরা এলাকার মানুষের পাশে দাড়িয়ে দৃষ্ঠান্ত স্থাপন করেছে। এছাড়া এলাকার মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান, বৃক্ষ রোপন প্রতিযোগিতার আয়োজনসহ নানাভাবে কাজ করে যাচ্ছে সংগঠনটি। একইভাবে ঢাকাস্থ মিরপুর উপজেলা সমিতি বা কুষ্টিয়া জেলা সামিতির সাথে সম্পৃক্ত থেকেও জন্মজেলার মাটি ও মানুষের সান্নিধ্যে থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছি।

আব্দুর রব: এই পথ যদি না শেষ হয়। তবে কেমন হত তুমি বলতো, সব্যসাচী সংগঠক! যে পথের মায়ায় আপনি ছুটছেন নিরন্তর সেই পথের শুরু….টা

নাজমুল হুদা: রবি ঠকুরের মত বলতে হয়
‘এই তো পায়ে চলার পথ।
এসেছে বনের মধ্যে দিয়ে মাঠে,
মাঠের মধ্যে দিয়ে নদীর ধারে,
খেয়া-ঘাটের পাশে বটগাছ-তলায়;
তারপরে ওপারের ভাঙা ঘাট থেকে বেঁকে চলে গেছে গ্রামের মধ্যে’

শুরুটাতো সেই গ্রাম থেকেই। বলতে গেলে ‘জন্ম থেকেই জ¦লছি। ভিতরের তাড়ণা আর পরিবার, প্রতিবেশি, পরিচিতজনদের প্রেণায় আজব্দি এগিয়ে যাওয়া, এতোদূর আসা। চলার পথ সব সময় সহজ ও সরল ছিলনা। অনেকের মত আমারও প্রতিবন্ধকতা, প্রতিকূলতা ছিল; আশাভঙ্গের হতাশা, বিদ্রুপ ছিল তবে প্রতিজ্ঞা, পরিশ্রমে শেষ পর্যন্ত উতরে গেছি, টিকে আছি। কুষ্টিয়া জেলার মিরপুরের সাগরখালী নদের পাশঘেষা নওদা আজম পুর নামের সেই গ্রাম থেকে নিত্য ধুলো-কাদা মেখে বেড়ে ওঠা, গ্রামের স্কুলে পড়াশোনা। এরপর ক্রমেই কুষ্টিয়া জেলা শহর, খুলনা বিভাগীয় শহর কিংবা রাজধানী ঢাকা চিনতে শেখা, বাচতে আসা। এখনো ‘উৎস হতে নিরন্তর’ ছুটে চলা। আসলে জীবনে গন্তব্য বলে কিছু নেই, প্রতিটি পদক্ষেপই জীবন যাত্রার অংশ। এগিয়ে চলা, কাজ করে যাওয়ার নামইতো জীবন। এক সময় তো অনেক কিছুই ভাবতাম, অনেক কিছু হতে চাইতাম এমনকি এখানো চাই-সব কি আর পারি? পেরেছি? তাতেতো আর জীবন থেমে যাইনি। আবার রবী ঠাকুরকে আওড়াতে হয় ‘পথ কি নিজের শেষকে জানে, যেখানে লুপ্ত ফুল আর স্তব্ধ গান পৌঁছল, যেখানে তারার আলোয় অনির্বাণ বেদনার দেয়ালী উৎসব’।

‘আবার হবেতো দেখা, এ দেখাই শেষ দেখা নয়তো।’ এ প্রত্যাশায়……
আব্দুর রব।