বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ ফেলবে ইউক্রেন যুদ্ধ


sujon প্রকাশিত: ৭:৪০ পূর্বাহ্ণ ৫ মার্চ , ২০২২
বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ ফেলবে ইউক্রেন যুদ্ধ

অর্থ-বাণিজ্য ডেস্ক : রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছে বিশ্বব্যাংক। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে জানান, ইউক্রেনে যুদ্ধের ফলে বিশ্বে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। এতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ডেভিড মালপাস বলেন, একটি দুঃসময়ে রাশিয়া-ইউক্রেন সংকট দেখা দিয়েছে। কারণ যুদ্ধের আগে থেকেই বিশ্বে মূল্যস্ফীতির হার ঊর্ধ্বমুখী ছিল। তিনি বিশেষভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেন, এতে যেটা ঘটবে তা হলো একেবারে জীবনের ক্ষয়। ধারণা করা হচ্ছে, হাজারো বেসামরিক মানুষের পাশাপাশি যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে অসংখ্য সেনাসদস্য। মালপাস বলেছেন, ইউক্রেনের সীমান্তের বাইরেও যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব পড়েছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানির মূল্য বেড়েছে। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতির মতো এটিও দরিদ্রদের ওপর সবচেয়ে বেশি আঘাত হানতে যাচ্ছে। যুদ্ধের কারণে খাদ্যের দামও বেড়েছে এবং এটি দরিদ্র দেশগুলোর মানুষের জন্য বড় সমস্যা ও রূঢ় বাস্তবতা। তিনি উল্লেখ করেন, রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় দেশই বিশ্বের শীর্ষ খাদ্য উৎপাদক। ইউক্রেন হলো বিশ্বের সর্ববৃহৎ সূর্যমুখীর তেল উৎপাদক, এক্ষেত্রে তার পরেই রয়েছে রাশিয়ার অবস্থান। জ্বালানি কোম্পানি এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল প্ল্যাটস এ তথ্য জানিয়েছে। বৈশ্বিক মোট উৎপাদনের ৬০ শতাংশ এ দুটি দেশে হয়। জেপি মরগ্যানের তথ্য অনুসারে, বৈশ্বিক গম রফতানির ২৮ দশমিক ৯ শতাংশ হয় এ দুই দেশ থেকে। শিকাগো ফিউচার এক্সচেঞ্জে গমের দাম ১৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চে বেচাকেনা হচ্ছে।

নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ার কারণে রাশিয়া থেকে এসব নিত্যপণ্য সরবরাহের সুযোগ সীমিত হয়ে গেছে। ফলে তাদের পণ্য কেনা বাকি বিশ্বের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। এছাড়া ইউক্রেনের সরবরাহও বন্ধ রয়েছে। কেননা দেশটির আমদানি-রফতানি কাজের জন্য ব্যবহার হওয়া বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। বিশ্বব্যাংক প্রধান বলেন, ইউক্রেন ও রাশিয়া থেকে সরবরাহের ক্ষতি এত দ্রুত সমন্বয় করার উপায় নেই। ফলে এটি পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়।

শুধু খাদ্যপণ্য নয়, মালপাস বলেন, এটি রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রেও সত্য। বিশেষত ইউরোপের পশ্চিমাঞ্চলের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারগুলো কীভাবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাবে তার অন্য দিকগুলো অবহেলা করেছে বলে মনে করেন তিনি। বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ৩৯ শতাংশ জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়ে উৎপাদিত হয়। এক্ষেত্রেও তেল ও গ্যাসের বড় উৎস রাশিয়া। যেহেতু ইউরোপীয় ইউনিয়ন জ্বালানি শক্তির অন্য উৎসগুলোতে স্থানান্তর করতে চায়, এতে সম্ভবত পুতিনের সরকার তাদের বাজারের কিছু অংশ চিরতরে হারাবে। আয় কমে যাওয়া যুদ্ধের একটিমাত্র দিক, যার ফলে রাশিয়ার নাগরিকদের জীবনমান নিম্নমুখী করবে। এতে দেশটির মুদ্রা রুবলের মানের পতন ঘটবে এবং মুদ্রাস্ফীতি আরো বাড়বে।

২০১৪ সালের বিপ্লব-পরবর্তী ইউক্রেনের অর্থনীতির উন্নয়নে বিশ্বব্যাংক ৭ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই অর্থ দেশটির জ্বালানি ও ব্যাংক খাতের পুনর্গঠনসহ বড় পরিসরে অর্থনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি কৃষিজমিকে আরো উৎপাদনমুখী করার জন্য সহায়তা করেছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের এক মাসেরও কম সময় আগে ইনডিপেনডেন্ট সেন্ট্রাল ব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছিল করোনা মহামারীর কঠিন পরিস্থিতির পরও এ বছর ১৮০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির ৩ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির অর্থনৈতিক উপদেষ্টা আলেকজান্ডার রডনিয়ানস্কির মতে, যেভাবেই হোক যুদ্ধের অর্থই হলো সার্বিকভাবে সব অঞ্চলের অর্থনীতির জন্য বিপর্যয়। তিনি বলেন, আমরা এরই মধ্যে ব্যাপকভাবে রাস্তাঘাট, সেতু ও বিভিন্ন অবকাঠামোর ধ্বংস দেখেছি। যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলেও এগুলো পুনর্নির্মাণে কয়েক বছর লেগে যাবে। এখনই এসব ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা অত্যন্ত কঠিন। আমরা এরই মধ্যে যা দেখতে পাচ্ছি তাতে জিডিপির প্রবৃদ্ধির আশা ছেড়ে দিয়েছি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সুইফটে লেনদেনে নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যে সমস্যা হতে পারে। কিন্তু সব পথ বন্ধ হয়ে যায়নি। বিকল্প পথ এখনো খোলা আছে। এতে খরচ বাড়বে। তবে লেনদেন করা যাবে। এখন ডিজিটাল কারেন্সিতেও লেনদেন হচ্ছে। যদিও বাংলাদেশে এটি নিষিদ্ধ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, ১৯৭৫ সালের পর রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো বিনিয়োগ ২০১১ সালের আগে ছিল না। ২০১১ সাল থেকে বাংলাদেশে রাশিয়া বিনিয়োগ করতে থাকে। তবে তা খুবই ছোট অঙ্কে। ২০১৫ সালে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য রাশিয়ার সঙ্গে প্রযুক্তি ও ঋণের চুক্তি হলে তাদের বিনিয়োগ বাড়তে থাকে। এখন পর্যন্ত রাশিয়ার মোট বিনিয়োগের স্তিতি ১৪ কোটি ৩২ লাখ ডলার।

এর মধ্যে গত অর্থবছরে এসেছে ১৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার। এর আগে ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৫০ হাজার ডলার, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৩ লাখ ডলার, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ২ লাখ ডলার, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১২ লাখ ডলার, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১৬ লাখ ডলার, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২০ লাখ ডলার, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১৮ লাখ ডলার এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১১ লাখ ৫০ হাজার ডলার বিনিয়োগ এসেছে।

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করার পর থেকে চলমান বহুমুখী নিষেধাজ্ঞায় সে দেশের মুদ্রা রুবলের বড় ধরনের দরপতন ঘটেছে। ডলারের বিপরীতে প্রায় ৪৮ শতাংশ এবং টাকার বিপরীতে ৩১ শতাংশ হয়েছে দরপতন। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ১ ডলারে পাওয়া যেত ৭৫ রুবল। গত বৃহস্পতিবার পাওয়া গেছে ১১০ রুবল। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ১ টাকায় পাওয়া যেত ০.৭৮ রুবল।

গত বৃহস্পতিবার পাওয়া গেছে ১.২৮ রুবল। অন্যান্য সব মুদ্রার বিপরীতেই রাশিয়ার রুবলের দাম কমছে। এতে রাশিয়ার গ্রাহকরা স্থানীয় ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিচ্ছে। একই সঙ্গে অন্য মুদ্রায় রূপান্তর করছে। রাশিয়াতে রুবলকে অন্য মুদ্রায় রূপান্তরে কোনো বিধিনিষেধ এখনো সে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জারি করেনি।

তবে আর্থিক ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা রাখতে এ ব্যাপারে বিধিনিষেধ আরোপ করা হতে পারে বলে ধারণা করছেন ব্যাংকাররা। এদিকে মুদ্রার দরপতন ঠেকাতে সে দেশের শেয়ারবাজারও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা বাজারেও রুবলের চাহিদা কমে গেছে। গ্রাহকরা রুবল ছেড়ে অন্য মুদ্রায় বিনিয়োগ করছেন। এ পরিস্থিতিতে রাশিয়ান কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের নীতিনির্ধারণী সুদের হার সাড়ে ৯ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করেছে। যাতে বিদেশি গ্রাহকরা রুবল হাতছাড়া না করে। কিন্তু এ সিদ্ধান্তও রুবলের দরপতন ঠেকাতে পারছে না। এদিকে রুবলের দরপতনে বাংলাদেশের সে দেশ থেকে সাময়িকভাবে আমদানি খরচ কমবে। একই সঙ্গে কমবে রপ্তানি আয়ও।

রাশিয়া তেল, গ্যাস, গম, খনিজসম্পদসহ অন্যান্য রপ্তানির অর্থ সংগ্রহ ও আমদানির বিল পরিশোধ করে সুইফটের মাধ্যমে। এর মাধ্যমে লেনদেনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় তাদের ওই লেনদেন বাধাগ্রস্ত হবে। সুইফটের মোট লেনদেনের দেড় শতাংশ করে রাশিয়া। সুইফটের বাইরে গিয়ে এক ব্যাংক অন্য ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করে লেনদেন করলে খরচ বাড়বে। এতে আয় কম হবে।

২০১৪ সালে রাশিয়া ক্রাইমিয়া দখল করলে সুইফট থেকে রাশিয়াকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেয় ইউরোপীয় দেশগুলো। এরপর রাশিয়া দ্রুত তাদের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আছে এমন প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সীমান্ত বাণিজ্য চালু করার চেষ্টা করে। এর লেনদেনের জন্য চালু করে সুইফটের বিকল্প সিস্টেমস ফর ট্রান্সফার ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এসটিএফএস)। এর বাইরে চালু করে ন্যাশনাল পেমেন্ট কার্ড। যা এখন তেমন একটা কার্যকর নেই। বর্তমানে রাশিয়া লেনদেনে চীননির্ভরতা বাড়িয়ে দিয়েছে।

এদিকে ইউক্রেনের কয়েক হাজার (জাতিসংঘের হিসাবে ১০ লাখের বেশি) মানুষের দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া অথবা রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগদানের ফলে দেশটির কর্মশক্তিকে নাটকীয়ভাবে কমিয়ে দিয়েছে, যা যুদ্ধকালীন অর্থনীতিকে চালিয়ে নেয়া দুরূহ করে তুলেছে। ইউক্রেনে যুদ্ধের কারণে নেসলে ও ব্রিউয়ার কার্লসবার্গের মতো বড় পশ্চিমা খাবারজাত পণ্য উৎপাদন কোম্পানির কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংক ও বিদেশী বিনিয়োগ ইউক্রেনের অর্থনীতি নতুন রূপে গড়ে উঠতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট সতর্ক করেন যে এই যুদ্ধ ইউক্রেনের অর্থনীতি ও দেশটির নাগরিকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি বয়ে আনবে।