মানব সভ্যতায় গ্রীক মনীষীদের অবদান: অ্যারিস্টোটল


resma প্রকাশিত: ৪:৪৮ অপরাহ্ণ ৩ জুলাই , ২০২২
মানব সভ্যতায় গ্রীক মনীষীদের অবদান: অ্যারিস্টোটল

ড. মোহাম্মদ আবু হাসান ফারুক: প্রখ্যাত গ্রীক দার্শনিক প্লেটোর শিষ্য অ্যারিস্টোটল (৩৮৪-৩২২ খ্রীঃ পূর্ব) মূলতঃ একজন দার্শনিক হলেও তিনি একাধারে মনোবিজ্ঞানী, রাজনৈতিক চিন্তাবিদ, তর্কবিদ, জীববিজ্ঞানী ও সাহিত্যের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বিশেষ খ্যাতি সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি ত্রজিয়ান সাগরের উত্তর প্রান্তে অবস্থিত থ্রেসের অন্তর্গত স্টাজিয়া শহরে ৩৮৪ খ্রী: পূর্বব্দে জন্ম গ্রহন করেন। তাঁর পিতা মেসিডোনের দ্বিতীয় ত্রমিনটাসের চিকিৎসক ছিলেন।

একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির সন্তান হিসেবে অ্যারিস্টোটল নিজের বাড়িতেই তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। তাঁর পিতা তাঁকে প্রকৃতি বিজ্ঞান সম্পর্কে শিক্ষা প্রদানে আগ্রহী ছিলেন। ১৮ বৎসর বয়সে অ্যারিস্টোটল এথেন্সে গমন করেন এবং প্লেটোর একাডেমীতে ছাত্র হিসেবে যোগ দেন। এখানেই তাঁর আপন ভাবধারা ও চিন্তাধারার বিকাশ ঘটে। প্লেটোর চিন্তাধারার যেটুকু তিনি ভালো মনে করতেন তা গ্রহণ করতেন। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে প্লেটোর দর্শনকে আরো ব্যাপক ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করতেন।

অ্যারিস্টোটল দীর্ঘ ২০ বৎসর ধরে বিজ্ঞান ও দর্শন সম্বন্ধে অধ্যয়নের পর তিনি কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেন। খ্রী: পূর্ব ৩৪৮ সালে প্লেটোর মৃত্যুর পর তিনি ৪০ বৎসর বয়সে রাজা ফিলিপ কর্তৃক আমন্ত্রিত হয়ে মেসিডোনিয়ায় যান এবং আলেকজান্ডারের শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত হন। ৩৩৬ খ্রী: পূর্বাব্দে আলেকজান্ডার সিংহাসনে আরোহনের পর তিনি এথেন্সে ফিরে এসে লিসিয়াম নামক স্থানে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। একাডেমীর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে লিসিয়ামের বৈজ্ঞানিক কাজগুলি মূলত জীববিদ্যার উপর ন্যস্ত ছিল, পক্ষান্তরে একাডেমীতে গণিত ও জ্যোতিবিদ্যা নিয়ে আলোচনা করা হতো।

অ্যারিস্টোটল একদল লোক নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণার কাজ পরিচালনা করতেন। প্রায় এক হাজার লোক তাঁর নেতৃত্বে গ্রীস ও এশীয় ভূখন্ডের বিভিন্ন অংশে ভ্রমন করে স্থল ও জলচর প্রাণী সম্বন্ধে নানাবিধ তথ্য সংগ্রহ করে। তিনি জীব ও প্রাণীবিদ্যা নিয়ে গবেষণা করতেন। তিনিই সর্বপ্রথম প্রানীদেহ ব্যবচ্ছেদ করে অন্তঃস্থিত গঠন প্রকৃতির কয়েকটি পার্থক্য নির্দেশ করেন।

অ্যারিস্টোটল মূলত: একজন দার্শনিক হলেও তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তাঁর “ The treatise on the heavens” নামক প্রবন্ধে আলোচিত পৃথিবী ও সৌরজগত সম্পর্কিত ধারনা থেকে আমরা জানতে পারি এই বিশ্ব একটি নিয়ম শৃঙ্খলার মধ্যে আবদ্ধ। তাঁর মতে, পৃথিবী গোলাকার এবং ইহা সৌরজগতের মধ্যস্থলে অনঢ় অবস্থায় অবস্থিত। পৃথিবীর চারদিকে অন্যান্য নয়টি এক কেন্দ্রীক স্বচ্ছ গোলক পেয়াজের খোসার মতো একটির উপর আরেকটি অবস্থান করছে। সবচেয়ে ভেতরের গোলকে আছে চাঁদ, তারপরে যথাক্রমে সূর্য, বুধ, শুক্র, মঙ্গল, বৃহস্পতি ও শনি অবস্থান করছে। এবং সবচেয়ে বাহিরের দিকের গোলকে রয়েছে স্থির নক্ষত্র। এই মতবাদগুলোর সত্যতা প্রমাণের জন্য তিনি কিছু দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। যেমন, চন্দ্র গ্রহণের সময় পৃথিবীর যে ছায়া চাঁদের উপরে পড়ে তার আকার গোল দেখা যায়। সুতরাং প্রমাণিত হয় যে পৃথিবী গোলাকার। তাঁর মতে সূর্য ও চন্দ্রের মাঝে পৃথিবীর অবস্থানের ফলে চন্দ্রগ্রহণ হয়, কাজেই চন্দ্র ও সূর্য উভয়ই গোলাকার।

তাঁর সবচেয়ে বেশী বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব সম্বলিত যুক্তিটি হলো, পৃথিবীর চারপাশের বস্তুগুলি পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে আকর্ষিত হয় এবং এই পরিবেশের জন্যই পৃথিবী গোলাকার।

অ্যারিস্টোটল মন্তব্য করেন যে, পৃথিবীর পরিমাণ ৪,০০,০০০ স্টেডিয়া (হেরোডটাসের মতে, ১ স্টেডিয়া = ৬০০ গ্রীক ফুট) উল্লেখ করেন। তাঁর মতে ক্রান্তীয় ও উত্তর মেরু মন্ডলের মধ্যস্থলে অবস্থিত উত্তর গোলার্ধের নাতিশীতোষ্ণ মন্ডল পৃথিবীর বাসযোগ্য অঞ্চল এবং শীত ও উষ্ণতার আধিক্যের কারনে অন্যান্য অঞ্চলগুলিতে মনুষ্য বসতি গড়ে উঠেনি।

অ্যারিস্টোটল বাসযোগ্য পৃথিবীকে গোলাকার বলে মনে করতেন না। তিনি দক্ষিণ গোলার্ধে নাতিশীতোষ্ণ মন্ডল রয়েছে বলে মনে করতেন, তবে তা বসোপযোগী কিনা সে সম্বন্ধে কোন মন্তব্য করেননি।

অ্যারিস্টোটল জলবায়ুর আদ্রতা, বৃষ্টিপাত, শিলাবৃষ্টি, আবহাওয়া পরিবর্তন, ভূ-আলোড়ন, ভূ-পৃষ্ঠের ও সমুদ্রের ক্রমাগত ধীর পরিবর্তন, সমুদ্রস্রোত প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয় সম্বন্ধে অনেক মূল্যবান তথ্য উপস্থাপনা করেছেন। তাঁর মতে, অগভীর পলাস মেয়োটিস (আজোভসাগর), ইউকসিন (কৃষ্ণ সাগর) এবং এজিয়ান সাগর একে অন্যের সাথে যুক্ত এবং এই সাগরগুলোর গভীরতা ক্রমশ: হ্রাস পেয়েছে।

তিনি মানুষের মৌলিক পরিবেশ ও মানবিক অবস্থার মধ্যে সম্পর্ক খুঁজতে চেষ্টা করেন। তাঁর মতে, মৌলিক পরিবেশ মানুষের চারিত্রিক প্রকৃতির মধ্যে উদ্দীপনা, বুদ্ধিমত্তা ও কর্ম দক্ষতার বিরাট পরিবর্তন সাধন করে । তিনি মনে করতেন, প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে মানুষের দৈহিক গঠনের বিশেষ সাদৃশ্য রয়েছে এবং আবহাওয়ার সাথে সাথে মানুষের শরীরের ব্ত্তান্ত পরিবর্তিত হয় ।

অ্যারিস্টোটলের মতে, দেশের সীমানা পাহাড় ও একাধিক সমুদ্র দ্বারা বেষ্টিত হলে তা সামরিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়। সেদিক দিয়ে বিবেচনা করলে গ্রীসের ভৌগোলিক অবস্থান প্রায় অনুরূপ। তাঁর “Politics” গ্রন্থে পৃথিবীর ইতিহাসের উপর ভৌগোলিক অবস্থানের কথা বলা হয়েছে।

অ্যারিস্টোটলের মতে, এশিয়ার অধিকাংশ নদী এই অঞ্চলের সর্বোচ্চ পাহাড় প্যানারেস থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে। এই নদীগুলোর মধ্যে ব্যাকট্রোয়াস, চোয়াসপার, আরেক্সেস প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। তাঁর মতে সিন্ধু নদীও এই পাহাড় হতে উৎপত্তি লাভ করেছে। কিন্তু ইউফ্রেটিস ও তাইগ্রীস সম্বন্ধে তিনি কোন মন্তব্য করেননি।

অ্যারিস্টোটল মনে করতেন, ইউরোপের সর্বোচ্চ অঞ্চল হলো উত্তর-পূর্বে অবস্থিত ককেশাস। আর এখান থেকেই ফাসিসের মতো অনেক নদীর উৎপত্তি হয়েছে। তিনি কাস্পিয়ান সাগর সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন । তাঁর মতে, এই সাগর সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ভাবে অবস্থিত এবং এর চারিদিকে বসতি রয়েছে।

প্রকৃতপক্ষে আফ্রিকা সম্বন্ধে অ্যারিস্টোটলের কোন ধারনা ছিলনা। তিনি নীল নদ সিলভার পর্বত থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে বলে বর্ণনা করেন। এছাড়া এহিওপিয়া পর্বত থেকে উৎপন্ন কতিপয় অজ্ঞাত নদীর কথা তিনি উল্লেখ করেন।

তাঁর প্রিয় শিষ্য আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর ৩২৩ খ্রী: পূর্বাব্দে এথেন্সের মেসিডোনিয় দল অ্যারিস্টোটলকে অধার্মিক বলে অভিযুক্ত করলে তিনি সক্রেটিসের পরিণামের কথা ভেবে নিজের কিছু সংখ্যক শিষ্যের সাথে এথেন্স ত্যাগ করেন। খ্রী: পূর্ব ৩২২ সালে ৬২ বৎসর বয়সে স্বাভাবিক ভাবেই মৃত্যুবরন করেন।