রাশিয়া-ইউক্রেন দ্বিতীয় দফা বৈঠক শুরু


ইতিহাস ডেস্ক প্রকাশিত: ১১:৪৪ অপরাহ্ণ ৩ মার্চ , ২০২২
রাশিয়া-ইউক্রেন দ্বিতীয় দফা বৈঠক শুরু

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণ দ্বিতীয় সপ্তাহ গড়ানোর সাথে সাথে দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদের দ্বিতীয় দফার বৈঠক শুরু হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে বৃহস্পতিবার প্রতিবেশী বেলারুশের গোমেল অঞ্চলের অজ্ঞাত এক স্থানে এই বৈঠক শুরু হয়েছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন বৈঠক শুরুর ছোট একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যাচ্ছে, ইউক্রেনের প্রতিনিধিরা একটি সম্মেলন কক্ষে প্রবেশ করছেন; যেখানে আগে থেকেই বসে আছেন রুশ প্রতিনিধিরা। বৈঠক শুরুর আগে দুই দেশের কর্মকর্তারা করমর্দন করেন।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা মিখাইলো পোডোলিয়াক এক টুইট বার্তায় বলেছেন, রাশিয়ান প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক শুরু হয়েছে। আজকের আলোচনার মূল বিষয়:

১. অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি
২. অস্ত্রবিরতি
৩. অবিরাম গোলাবর্ষণে ধ্বংস হয়ে যাওয়া শহর এবং গ্রাম থেকে বেসামরিক লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য মানবিক করিডোর চালু।

এর আগে, গত সোমবার বেলারুশের গোমেল অঞ্চলে ইউক্রেন এবং রাশিয়ার প্রতিনিধিদের মধ্যে প্রথম দফার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কোনো ধরনের চুক্তিতে পৌঁছানো ছাড়াই ওই বৈঠক শেষ হয় এবং দ্বিতীয় দফায় বৈঠকে বসতে রাজি হয় উভয় পক্ষ।

বৃহস্পতিবারের বৈঠকে কিয়েভের প্রতিনিধি দলে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওলেকজি রেজনিকোভ, প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা মিখাইলো পোডোলিয়াক, ক্ষমতাসীন সার্ভেন্ট অব দ্য পিপল পার্টির একাংশের প্রধান ডেভিড আরাখামিয়া, উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিকোলে তোচিৎস্কি এবং অন্যান্যরা রয়েছেন। অন্যদিকে, রাশিয়ার প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের শীর্ষ সহযোগী ভ্লাদিমির মেডিনস্কি।

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নির্দেশের পর ইউক্রেনে শুরু হওয়া আক্রমণে এখন পর্যন্ত শত শত রুশ সৈন্য এবং ইউক্রেনীয় বেসামরিক নিহত হয়েছেন। এই আক্রমণ শুরুর পর বিশ্বে নজিরবিহীন বিচ্ছিন্নতা ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হয়েছে রাশিয়া।

জাতিসংঘ বলেছে, মাত্র সাত দিনেই ইউক্রেন ছেড়ে পালিয়েছেন প্রায় ১০ লাখ মানুষ। এতসংখ্যক মানুষের দেশত্যাগের এই ঘটনাকে দ্রুততম বলছে সংস্থাটি।

ইউক্রেনের প্রতিনিধি দলের সদস্য ডেভিড আরাখামিয়া গোমেলে যাওয়ার আগের একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করে লিখেছেন, বৈঠকে অংশ নিতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি চলছে। তবে ওই বৈঠক কোথায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে, সেবিষয়ে কোনো তথ্য দেননি তিনি।

তিনি বলেন, আজ ন্যূনতম আলোচ্যসূচি মানবিক করিডর চালু। তবে সোমবার বেলারুশে অনুষ্ঠিত প্রথম দফার আলোচনায় কোনো অগ্রগতি না আসায় এই বৈঠকেও সাফল্যের প্রত্যাশা করছে না উভয়পক্ষই।

এদিকে, রাশিয়ার হামলাকে ভাইরাস হিসাবে অভিহিত করে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, দেশে এক সপ্তাহ হয়েছে আরেকটি ভাইরাস আক্রমণ করেছে। বৃহস্পতিবার এক ভিডিও বার্তায় রুশ হামলা নিয়ে ভ্লাদিমির পুতিনকে সরাসরি উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, ‘বাড়ি ফিরে যাও। তোমার বাড়িতে ফিরে যাও।’

তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে রুশ-ভাষী জনগণকে নয়, রাশিয়ায় থাকা রুশ-ভাষীদের রক্ষা করা উচিত পুতিনের। সেখানে তাদের কিছু মানুষ আছে। প্রায় ১৫ কোটি।

মস্কো ইউক্রেনের বিভিন্ন প্রান্তে রুশ-ভাষী জনগণকে রক্ষায় পদক্ষেপ নিয়েছে বলে যে দাবি করেছে, সেটির উল্লেখ করে এসব কথা বলেছেন জেলেনস্কি। রাশিয়ার হামলাকে ভাইরাস হিসাবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইউক্রেন দুই বছর আগে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত করেছিল। এখন এক সপ্তাহ হয়ে গেছে, আরেকটি ভাইরাস আক্রমণ করেছে।

বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে ইউক্রেনে রাশিয়ার সৈন্যরা বিরামহীন গোলাবর্ষণ করছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। জেলেনস্কি বলেন, আমাদের স্বাধীনতা ছাড়া হারানোর আর কিছু নেই। আন্তর্জাতিক মিত্রদের কাছ থেকে ইউক্রেন প্রত্যেকদিন অস্ত্র পাচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

ইউক্রেনের এই প্রেসিডেন্ট বলেছেন, রাশিয়ার কৌশলে পরিবর্তন এবং শহরজুড়ে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর গোলাবর্ষণ প্রমাণ করে মস্কোর স্থল আক্রমণের মাধ্যমে দ্রুত বিজয় অর্জনের প্রাথমিক লক্ষ্য ব্যর্থ করে দেওয়া হয়েছে। যুদ্ধের কারণে যারা কাজ করতে অক্ষম তাদের পেনশন দেওয়া হচ্ছে। এই যুদ্ধে ১৬ হাজার বিদেশী স্বেচ্ছায় ইউক্রেনের হয়ে লড়াই করছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।

আবেগপূর্ণ বক্তৃতায় জেলেনস্কি বলেছেন, ইউক্রেনীয়রা দু’টি বিশ্বযুদ্ধ, হলোডোমোর দুর্ভিক্ষ, হলোকাস্ট, সোভিয়েত সন্ত্রাস, চেরনোবিল পারমাণবিক বিস্ফোরণের পাশাপাশি রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখল এবং বিদ্রোহীদের প্রতি মস্কোর সমর্থনের মাঝেও বেঁচে ছিলেন।

ইউক্রেনে ‘সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি সামনে আসছে’ বলে মন্তব্য করেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। বৃহস্পতিবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ৯০ মিনিটের ফোনালাপের পর তিনি বলেছেন, রাশিয়া পুরো ইউক্রেন দখলে নিতে পারে বলে তার মনে হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ফরাসি প্রেসিডেন্টের জ্যেষ্ঠ একজন সহযোগী বলেছেন, প্রেসিডেন্ট পুতিন তাকে (এমানুয়েল ম্যাঁক্রো) যা বলেছেন তার প্রেক্ষিতে সবচেয়ে খারাপ সময় আসছে বলে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ ধারণা করছেন। তিনি বলেন, ‘রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন আমাদের যা বলেছেন, তাতে এমন কিছু ছিল না যা আমাদের আশ্বস্ত করতে পারে। তিনি অভিযান চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় দেখিয়েছেন।’

ম্যাক্রোঁর ওই সহযোগী বলেন, পুতিন পুরো ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণ নিতে চান। পুতিনের ভাষায়, ‘ইউক্রেন নাৎসিমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলবে।’ তিনি বলেন, ‘আপনি বুঝতে পারেন এসব শব্দ কতটা মর্মান্তিক এবং অগ্রহণযোগ্য।’

ইউক্রেনে বেসামরিক হতাহতের ঘটনা এড়ানো এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি করে দিতে পুতিনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট। তবে পুতিন সেখানে মানবিক সহায়তার পক্ষে বলে ম্যাক্রোঁকে জানালেও কোনো ধরনের প্রতিশ্রুতি দেননি।

রাশিয়ার পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ দুমার একজন সদস্য বলেছেন, মস্কো ১২ মাস আগেই ইউক্রেন আক্রমণের পরিকল্পনা শুরু করেছিল। ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার দ্বিতীয় সপ্তাহে বুধবার রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত টেলিভিশন চ্যানেল ওয়ান টিভিকে এই তথ্য জানিয়েছেন তিনি।

রিফাত শায়খুৎদিনভ নামে ওই সংসদ সদস্য বলেন, আমরা এই হামলা প্রস্তুত করিনি। এটি স্বতঃস্ফূর্তভাবেই এসেছে। চ্যানেল ওয়ানের দৈনিক টকশো ‘টাইম উইল টেল’-এ অংশ নিয়ে তিনি বলেন, এই হামলার ব্যাপারে এক বছর ধরে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল। হয়তো আরও বেশি সময় আগে থেকে। ইউক্রেনে কী ঘটছে আমরা সেটি বোঝার চেষ্টা করেছি। তাদের আগাম সতর্ক করেও দেওয়া হয়েছিল।

দুমার এই সদস্য বলেছেন, আক্রমণ না চালালে হামলার মুখে পড়ত রাশিয়া। তিনি বলেন, ‘‘গোয়েন্দা তথ্যে আমরা জানতে পেরেছিলাম আক্রমণের দু’দিনের মধ্যে তাদের পরাজিত করতে পারব। অবশ্যই আমরা সেখানে আমাদের নাগরিকদের রক্ষা করছি।’’

সূত্র: এএফপি, বিবিসি, রয়টার্স।