রাশিয়া ও ইউক্রেনের ঐতিহাসিক বিরোধের শেকড়ের সন্ধানে


rupali প্রকাশিত: ৬:৩৩ অপরাহ্ণ ২৩ ফেব্রুয়ারি , ২০২২
রাশিয়া ও ইউক্রেনের ঐতিহাসিক বিরোধের শেকড়ের সন্ধানে

ইতিহাস ডেস্ক: চারিদিকে যখন ইউক্রেন রাশিয়া সংকটের খবর, প্রশ্ন জাগতে পারে এই সংকটের পেছনের ইতিহাসটা কেমন, এর শুরুটাই বা কীভাবে। দেশ দুটির দীর্ঘ ইতিহাসের দিকে তাকালে এই সংকটের শুরুটা কীভাবে তা কিছুটা পরিষ্কার হবে।

দুটি দেশের পরস্পরের সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িয়ে থাকা এ ইতিহাসের শুরুটা আজ থেকে এক হাজার বছরেরও বেশি সময় আগে, যখন কিয়েভ ছিল প্রথম স্লাভিক রাষ্ট্র কিয়েভান রুশের কেন্দ্রস্থল। বর্তমানে ইউক্রেনের রাজধানী এই কিয়েভ। এখান থেকেই আজকের রাশিয়া আর ইউক্রেনের জন্ম। ৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে নভোগর্ডের পেগান প্রিন্স ও কিয়েভের গ্র্যান্ড প্রিন্স ভ্লাদিমির দ্য গ্রেট খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে, তাকে ব্যাপটাইজ করা হয় ক্রিমীয় শহর চেরসোনেসাসে।

সেই সময়ের কথা উল্লেখ করে বর্তমান রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট পুতিন সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন, “রাশিয়ান আর ইউক্রেনিয়ানরা এক জাতি”।

কিন্তু তারপরও বিগত ১০ শতক ধরে ক্ষমতাসীন পক্ষের হাতে ইউক্রেন বারংবার খন্ড-বিখন্ড হয়েছে। পূর্বের মঙ্গোলীয় যোদ্ধারা ১৩ শতকে কিয়েভান রুশ জয় করে। ১৬ শতকে দখল করে পশ্চিমের পোলিশ ও লিথুয়ানিয়ান বাহিনী। ১৭ শতকে পোলিশ-লিথুয়ানিয়ান কমনওয়েলথ আর রুশ জারতন্ত্রের যুদ্ধের ফলস্বরূপ নিপার নদীর পূর্বের অঞ্চল রাশিয়ার দখলে যায়। আর নিপার নদীর পূর্বের অংশের নাম হয়ে যায় বাম-তীর ইউক্রেন, পশ্চিমের অংশের নাম হয়ে যায় ডান-তীর ইউক্রেন, আর শাসন ক্ষমতায় ছিল পোল্যান্ড।

এরও আরও ১০০ বছরের বেশি সময় পরে, ১৭৯৩ সালে ডান-তীর ইউক্রেন দখল করে নেয় রাশিয়ান সাম্রাজ্য। এর পরের বছর রাশিফিকেশন নামের এক নীতির মাধ্যমে ইউক্রেনিয়ান ভাষা ব্যবহার আর এ সংক্রান্ত পড়াশোনা নিষিদ্ধ করা হয়। এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষকে রাশিয়ান অর্থোডক্স বিশ্বাসের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য করা হয়।

২০ শতকে এসে ইতিহাসের অন্যতম মারাত্মক ঝড় বয়ে যায় ইউক্রেনের ওপর। ১৯১৭ সালের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর, ১৯২২ সালে পুরোপুরিভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ হয়ে যাওয়ার আগে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যায় ইউক্রেন। ১৯৩০ এর দশকের শুরুতে সোভিয়েত নেতা জোসেফ স্টালিন ইউক্রেনিয়ান কৃষকদের সম্মিলিত খামারে যোগ দিতে বাধ্য করায় দেশটিতে দুর্ভিক্ষ নেমে আসে। যার ফলে না খেতে পেয়ে মারা যায় লাখ লাখ ইউক্রেনিয়ান। এরপর ইউক্রেনের জনসংখ্যা বাড়াতে বিশাল সংখ্যক রাশিয়ান ও অন্যান্য সোভিয়েত নাগরিকদের ইউক্রেনে পাঠান স্টালিন। এদের অনেকেই ইউক্রেনের ভাষা জানতো না, ওই অঞ্চলের সঙ্গে তাদের তেমন কোনো সম্পর্কও ছিল না।

ইতিহাসের এসব ঘটনার প্রভাবও দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী হয়। পূর্ব ইউক্রেন পশ্চিম ইউক্রেনের অনেক আগেই রাশিয়ান শাসনের অধীনে যাওয়ায়, রাশিয়ার সঙ্গে পূর্বের মানুষের সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে বেশি, রাশিয়ান নেতাদের প্রতি সমর্থন দেবে তারা- এ সম্ভাবনাও বেশি। অন্যদিকে, পশ্চিম ইউক্রেন শতকের পর শতক ধরে পোল্যান্ড ও অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের মতো ইউরোপীয় শক্তির অধীনে ছিল- এ কারণে হয়তো পশ্চিম ইউক্রেনের মানুষের পশ্চিম-ঘেষা রাজনীতিবিদদের প্রতি সমর্থন বেশি। পূর্বাঞ্চলের মানুষের মধ্যে রাশিয়ান ভাষায় কথা বলার আর অর্থোডক্স হওয়ার প্রবণতা বেশি। অন্যদিকে পশ্চিম অংশের মানুষের বেশিরভাগ ক্যাথোলিক আর ইউক্রেনীয় ভাষায় কথা বলে।

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর ইউক্রেন স্বাধীন দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়। কিন্তু দেশটির মানুষদের মধ্যে ঐক্য স্থাপনের কাজ ছিল বেশ কঠিন। কারো জন্য ইউক্রেনীয় জাতীয়তাবাদ পশ্চিমের অনেকের মতো অতোটা গভীর নয়, এমন মন্তব্য করেছিলেন ইউক্রেনে নিয়োজিত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত স্টিভেন পিফার।

গণতন্ত্র ও পুঁজিবাদের দিকে এগোনোর যাত্রাটা ইউক্রেনের জন্য বেশ বেদনাদায়ক আর বিশৃঙ্খলাময় ছিল। অনেক ইউক্রেনিয়ান, বিশেষ করে পূর্বাঞ্চলের বাসিন্দারা এর আগের কয়েক যুগের মতো স্থিতিশীল অবস্থা চাইতো।

ইউক্রেন বিশেষজ্ঞ ও অ্যাটলান্টিক কাউন্সিল অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটসের সাবেক ফেলো আদ্রিয়ান কারাতনিকি বলেছিলেন, “এ সব কিছুর পরেও সবচেয়ে বড় বিভেদ হলো তাদের মধ্যে, যারা রাশিয়ান সাম্রাজ্য আর সোভিয়েন শাসনকে সহানুভূতির চোখে দেখে আর যারা একে ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখে”।

২০০৪ সালের কমলা বিপ্লবের সময় এ বিভেদ সামনে আসে। কমলা বিপ্লবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি নির্মূলের মতো দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে লাখো মানুষ জমায়েত হয়েছিল ইউক্রেনের রাজপথে।

হার্ভার্ডের অধ্যাপক ও বিশ্ববিদ্যালয়টির ইউক্রেনিয়ান রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক সারহি প্লোখি বলেন, মানচিত্রে ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চল আর পূর্বাঞ্চলের মধ্যকার বিভাজনও দেখা যায়। এই দুই অংশে দেখা যায় বিস্তৃত তৃণভূমি, উর্বর কৃষজমি। অন্যদিকে, উত্তর আর পশ্চিমাঞ্চলে বনভূমি বেশি। তিনি বলেন, মানচিত্র এ দুই ভাগের মধ্যে যে সীমারেখা নির্দেশ করে, তার সঙ্গে ইউক্রেনের ২০০৪ ও ২০১০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের লক্ষণীয় মিল দেখা যায়।

২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখল করে নিজেদের অংশ করে নেয় রাশিয়া। এরপর আজ ইউক্রেনের দুই বিদ্রোহী অঞ্চল দোনেস্ক-লুহানস্ককে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়েছে রাশিয়া। আজ আবারও ইউক্রেনের সীমান্তের দিকে এগোচ্ছে রাশিয়ান সেনারা। ভ্লাদিমির পুতিন সেখানে রুশ সেনা মোতায়েনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণাও করেছেন। তারপরই শুরু হয়েছে বড়-পরিসরে রুশ সমর শক্তির অবস্থান বদল। এ যেন ইউক্রেনে আগ্রাসনেরই পূর্ব প্রস্তুতি। এরপর কী হবে? রুশ সেনারা কী ওই অঞ্চল দুটিতেই থাকবে নাকি ইউক্রেনের আরও বড় অংশকে দখলে নেবে?- প্রশ্নগুলোর উত্তর দেবে আসছে সময়ের ঘটনাপ্রবাহ।

সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক