রাশিয়া কেন ন্যাটোকে বিশ্বাস করে না?


sujon প্রকাশিত: ৯:৩০ অপরাহ্ণ ২৭ ফেব্রুয়ারি , ২০২২
রাশিয়া কেন ন্যাটোকে বিশ্বাস করে না?

ইতিহাস ডেস্ক : ইউক্রেনে আক্রমণ চালিয়েছে রাশিয়া। এতে ৭৩ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে সামরিক জোট ন্যাটো। যুদ্ধটা হচ্ছে ন্যাটো অঞ্চলের পূর্ব সীমান্তের পাশেই। আর ন্যাটোর কিছু সদস্যদেশের আশঙ্কা, রাশিয়া হয়তো এরপরই তাদের ওপর হামলা চালাবে।

পশ্চিমা মিত্ররা পূর্ব ইউরোপে বাড়তি সেনা পাঠাচ্ছে বটে, কিন্তু চলমান যুদ্ধে সরাসরি অংশ নেয়ার কোনো ইচ্ছে তাদের নেই। 

ন্যাটো কী?

সামরিক জোট ন্যাটো-নর্থ অ্যাটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন—গঠিত হয় ১৯৪৯ সালে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সসহ এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ১২টি দেশ। ন্যাটোর মৌলিক নীতি হচ্ছে, এই জোটের যেকোনো সদস্য আক্রান্ত হলে বাকি সব সদস্য তাকে রক্ষায় এগিয়ে আসতে বাধ্য।

ন্যাটোর মূল লক্ষ্য ছিল ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর রুশ আগ্রাসন রুখে দেওয়া। এ কারণে কোনো এশীয় দেশকে এর সদস্য করা হয়নি।

১৯৫৫ সালে ন্যাটো গঠনের প্রতিক্রিয়ায় সোভিয়েত রাশিয়া তার পূর্ব ইউরোপীয় সমাজতান্ত্রিক মিত্র দেশগুলোকে নিয়ে ওয়ারশ প্যাক্ট নামে নিজস্ব সামরিক জোট গঠন করে।

কিন্তু ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ওয়ারশ প্যাক্টের অনেক সদস্য রাষ্ট্রই পক্ষ বদলে ন্যাটোতে যোগ দেয়। বর্তমানে ৩০টি দেশ ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্র।

রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের চলমান সংকটের কারণ কী?

ইউক্রেন সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত রাষ্ট্র। সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের পর ১৯৯১ সালে দেশটি স্বাধীন হয়। একদিকে রাশিয়া ও অপরদিকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সঙ্গে সীমান্ত রয়েছে ইউক্রেনের। দেশটিতে রুশ বংশোদ্ভূত মানুষের সংখ্যা অনেক। এছাড়াও রাশিয়ার সঙ্গে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনও রয়েছে ইউক্রেনের।

কৌশলগত দিক থেকে রাশিয়া ইউক্রেনকে নিজের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করে। সম্প্রতি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও প্রকাশ্যে ইউক্রেনকে রাশিয়ার অংশ দাবি করেছেন।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউক্রেন ধীরে ধীরে পশ্চিমের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও ন্যাটোর সদস্যপদ চায় দেশটি।

ইউক্রেন এখন ন্যাটোর মিত্র। এর অর্থ হলো, ভবিষ্যতে কোনো সময় দেশটি ন্যাটোতে যোগ দিতে পারবে। কিন্তু ইউক্রেনকে যেন কখনও ন্যাটোর সদস্য করা না হয়, পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে সে নিশ্চয়তা চায় রাশিয়া।

তবে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এ নিশ্চয়তা দিতে রাজি না। তাদের দাবি, স্বাধীন দেশ হিসেবে ইউক্রেন নিজের নিরাপত্তা ও যেকোনো জোটে যোগ দেয়ার ব্যাপারে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার রাখে।

আর কী নিয়ে উদ্বিগ্ন রাশিয়া?

প্রেসিডেন্ট পুতিনের দাবি, পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার অঞ্চলে প্রবেশের জন্য ন্যাটোকে ব্যবহার করছে। পূর্ব ইউরোপে ন্যাটোর সামরিক কর্মকাণ্ড থামাতে চান তিনি।

পুতিন বলছেন, ১৯৯০ সালে পূর্ব ইউরোপে ন্যাটোকে বিস্তৃত না করার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, সেই প্রতিশ্রুতি তারা রাখেনি। এ কারণে তারা ন্যাটোকে বিশ্বাস করে না।

অন্যদিকে আমেরিকার দাবি, তারা কখনও এমন কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি। ন্যাটো দাবি করছে, তাদের অল্প কয়েকটি সদস্য দেশেরই কেবল রাশিয়ার সঙ্গে সীমান্ত রয়েছে এবং ন্যাটো একটি প্রতিরক্ষা জোট।

রাশিয়া ও ইউক্রেনের সঙ্গে কী করেছে ন্যাটো?

২০১৪ সালে বিক্ষোভের মুখে ইউক্রেনের রুশপন্থী সরকারের পতন হয়। এর কয়েক মাস পরই ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের ক্রিমিয়া উপদ্বীপ দখল করে নেয় রাশিয়া। এছাড়াও পূর্বদিকের বিচ্ছিন্নতাবাদী দনবাস অঞ্চলকে স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদা দিয়ে সেখানে সেনাবাহিনী পাঠিয়েছেন পুতিন।

এতে হস্তক্ষেপ করেনি ন্যাটো, তবে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে সেনা মোতায়েন করেছে। উদ্দেশ্য, ভবিষ্যতে কখনও ন্যাটো অঞ্চলের দিকে আগ্রাসন চালালে, তা আটকানো। এছাড়াও রাশিয়া ও ইউক্রেনের সীমান্ত অঞ্চলে সেনা উপস্থিতি বাড়াচ্ছে ন্যাটো।

এস্তোনিয়া, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া ও পোল্যান্ডে চারটি করে ব্যাটালিয়ন রয়েছে ন্যাটোর। তাছাড়া জোটটি পূর্ব ইউরোপীয় ও বাল্টিক দেশগুলোতে বিমান নজরদারি বাড়িয়েছে।

রাশিয়া বলছে, এসব অঞ্চল থেকে এই বাহিনীগুলোকে সরিয়ে নিতে হবে।

চলমান সংকটে ন্যাটো কী করছে?

ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলের সীমান্তগুলোকে শক্তিশালী করতে যুক্তরাষ্ট্র পোল্যান্ড ও রোমানিয়ায় ৩ হাজার বাড়তি সেনা মোতায়েন করেছে। এছাড়াও আরও সাড়ে আট হাজার সৈন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

এর বাইরে ইউক্রেনে ইতোমধ্যে ২০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের অস্ত্র পাঠিয়েছে ন্যাটো। পাঠানো অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মিসাইল ও স্টিঙ্গার অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট মিসাইল। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রও ইউক্রেনে অস্ত্র পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ব্রিটেন ইউক্রেনকে ২ হাজার স্বল্প পাল্লার অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মিসাইল দিয়েছে। এছাড়া পোল্যান্ডে ৩৫০ ও এস্তোনিয়ায় ৯০০ ব্রিটিশ সেনা পাঠানো হয়েছে।

এছাড়া ব্রিটেন দক্ষিণ ইউরোপে আরএএফ যোদ্ধা ও ভূমধ্যসাগরে টহল দেওয়ার জন্য রয়্যাল নেভির যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছে। তাছাড়া আগে থেকেই ন্যাটোর যুদ্ধজাহাজও রয়েছে ভূমধ্যসাগরে।

রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের ফলে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে, তাতে মানবিক সাহায্য দেয়ার জন্যও এক হাজার সৈন্য প্রস্তুত রেখেছে ব্রিটেন।

পূর্ব ইউরোপ এবং ভূমধ্যসাগরের পূর্বাঞ্চলে যুদ্ধবিমান ও যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছে ডেনমার্ক, স্পেন, ফ্রান্স এবং নেদারল্যান্ডসও।

এখন কী করবে ন্যাটো?

ন্যাটো ফাইটার জেট ও যুদ্ধজাহাজ প্রস্তুত রেখেছে, সেনা উপস্থিতি বাড়াচ্ছে রাশিয়া ও ইউক্রেনের সীমান্ত অঞ্চলে। এছাড়া ৪০ হাজার সদস্যবিশিষ্ট র‍্যাপিড ফোর্সকে পাঠাচ্ছে পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোতে। রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, হাঙ্গেরি, স্লোভাকিয়া ও অন্যান্য দেশেও সৈন্য পাঠাতে পারে ন্যাটো।

যুক্তরাষ্ট্রও ইউরোপে আরও সেনা পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে প্রেসিডেন্ট বাইডেন বলে দিয়েছেন, মার্কিন সৈন্য সরাসরি ইউক্রেনে গিয়ে যুদ্ধ করবে না।

 

সূত্র: বিবিসি