শুধু কি পুরুষরাই ‘সাইকোপ্যাথ’ হয়?


rupali প্রকাশিত: ৬:২৮ অপরাহ্ণ ২৩ ফেব্রুয়ারি , ২০২২
শুধু কি পুরুষরাই ‘সাইকোপ্যাথ’ হয়?

ফিচার ডেস্ক : আপনি যদি কোনো কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার কিংবা সত্যিকারের ঘটনা অবলম্বনে কোনো ‘ক্রাইম ডকুমেন্টারির’ কথা ভাবেন, তাহলে এর মূল চরিত্রে একজন পুরুষের ছবিই আপনার মনে ভেসে ওঠার সম্ভাবনা বেশি। সঙ্গত কারণেই এক্ষেত্রে বেশিরভাগ অপরাধী পুরুষ হয়ে থাকেন।

উদাহরণ হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার ব্যুরো অফ স্ট্যাটিস্টিকসের তথ্য তুলে ধরা যেতে পারে। সংস্থাটির মতে, জেলখানায় বন্দীদের মধ্যে নারীদের সংখ্যা ৮ শতাংশেরও কম। শুধু অস্ট্রেলিয়াতেই নয়; বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে সহিংসতা ও যৌন অপরাধীদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। অপরাধ সংগঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের লিঙ্গভিত্তিক এমন প্রবণতার কারণে অপরাধবিদরা একবার ভাবতে শুরু করেছিলেন, কেবল ‘ওয়াই’ ক্রোমোজোমই (শুধু পুরুষদের মাঝেই পাওয়া যায়) কি তাহলে এ ধরনের অপরাধমূলক আচরণের জন্য দায়ী!

তবে ইদানিং ‘পুরুষরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না’- এমন যুক্তির প্রভাব খুব কমই খাটছে। এর পরিবর্তে, অপরাধের ক্ষেত্রে সামাজিক গঠন এবং এটি কীভাবে নারী ও পুরুষ জীবনের অভিজ্ঞতায় পার্থক্য তৈরি করে অপরাধ প্রবণতায় অবদান রাখছে, তার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন গবেষকরা।

‘সাইকো’ বনাম ‘সোসিও’
মনোবিজ্ঞানী ও পরামর্শদাতা স্কট জনসন মনে করেন, সমস্ত সোসিওপ্যাথ এবং সাইকোপ্যাথ যে পুরুষই হবেন, এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা; এমনকি যদি একজন নারীর এমন হওয়ার সম্ভাবনাও কম থাকে। নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই এমন অবস্থা তুলনামূলকভাবে বিরল বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। স্কট জনসন আইনপ্রণেতা ও প্রসিকিউটরদের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রশিক্ষক।

তিনি বলেন, “মোটামুটিভাবে বলতে গেলে, সাধারণ জনসংখ্যার মাত্র ১ শতাংশ সাইকোপ্যাথ; আরো দুই বা তিন শতাংশ সোসিওপ্যাথ হতে পারে।”

সাইকোপ্যাথ এবং সোসিওপ্যাথ দুটি ভিন্ন ধরনের ‘চরম অসামাজিক’ আচরণগত সমস্যা। এই দুই ধরণের আচরণই জীবন-সংহারক সহিংসতা ঘটাতে সক্ষম; এমনকি এটি অন্য ব্যক্তির ভালো-মন্দ অনুভূতির ব্যাপারেও তোয়াক্কা করে করে না।

তবে আচরণের এই ধরণ দুটির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। একজন সাইকোপ্যাথ ত্রুটিপূর্ণ মস্তিষ্ক নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন। মস্তিষ্কের এই ত্রুটির কারণেই তিনি স্বাভাবিক সামাজিক আচরণ করা থেকে বিরত থাকেন। অন্যদিকে, একজন সোসিওপ্যাথ স্বাভাবিক মস্তিষ্ক নিয়েই জন্মান; কিন্তু বয়সের সঙ্গে তার মস্তিষ্ক সঠিকভাবে বিকশিত হয় না। এক্ষেত্রে প্রায়শই দেখা যায়, ছোটবেলায় মানসিকভাবে আঘাত পাওয়ার কারণেই মূলত তারা আচরণগত সমস্যায় পড়েন।

সাইকোপ্যাথদের সাধারণত যেকোনো বিষয়ে পরিতৃপ্তি পেতে দেরি হয় এবং মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এ কারণেই তারা সূক্ষ্মভাবে তাদের অপরাধগুলোকে সাজাতে বা পরিকল্পনা করতে পারে। তাদেরকে প্রায়শই ‘মন্দ প্রতিভাধর’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়।

অন্যদিকে, সোসিওপ্যাথরা তাদের আবেগের নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না; পারলেও সেটি সাইকোপ্যাথদের তুলনায় কম। ফলে তারা যখন রেগে যান, তখন মারধর, ভাঙচুর এবং সহিংসতার মতো কাণ্ড ঘটান। মোটের ওপর সাইকোপ্যাথদের তুলনায় সোসিওপ্যাথদের বুদ্ধিমত্তা কম।

সাইকোপ্যাথিতে নারী-পুরুষ ভেদাভেদ:
জনসন বলেছেন, একজন নারী সাইকোপ্যাথের বিপরীতে অন্তত ৭জন পুরুষ সাইকোপ্যাথ রয়েছেন বলে ধারণা করা হয়। তবে এই তথ্যগুলো একদম সঠিক নাও হতে পারে; যেহেতু আমরা বরাবরই নারী সাইকোপ্যাথদের সংখ্যা কম বলেই মনে করি। এক্ষেত্রে আরও তথ্য নির্ভর গবেষণার প্রয়োজন।

এদিকে, ফরেনসিক সাইকোলজিস্ট জনি জনস্টন লিখেছেন, “নারী-পুরুষ ভেদে পরিসংখ্যানগত এই চিত্রটি একই মনস্তাত্ত্বিক আচরণকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করার আমাদের সংস্কৃতির একটি প্রবণতা।” অর্থাৎ একজন নারী নাকি একজন পুরুষের মাধ্যমে অপরাধ ঘটেছে- সেটির ওপর নির্ভর করেই সামগ্রিক এই পরিসংখ্যান দাঁড় করানো হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, “সাইকোপ্যাথির সকল বৈশিষ্ট্য রয়েছে এমন একজন নারী বন্দী অন্য রোগে, বিশেষ করে ‘পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার’-এ আক্রান্ত হওয়াও অস্বাভাবিক কিছু নয়।”

এ বিষয়ে জনসনও তার সঙ্গে একমত হয়েছেন। তিনি বলেন, “আমরা নারী অপরাধীদের সঙ্গে একই আচরণ করি না। আমরা বুঝতে চাই না যে, নারীরাও সহিংস হতে পারে। এটি আংশিকভাবে ‘সেক্সিজম’ বা লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য।”

বিশ্বজুড়ে নারী সাইকোপ্যাথদেরও উদাহরণ রয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, জঘন্য সব অপরাধের ক্ষেত্রে নারীরাও পুরুষদের মতোই সহিংস হয়ে উঠতে পারে। উদাহরণ হিসেবে হ্যাজেল ডালসি বডসওয়ার্থের কথা বলা যেতে পারে। ১৯৫০’র দশকে তিনি নিজের স্বামী এবং আরও দুই ব্যক্তিকে ঠান্ডা মাথায় খুন করেছিলেন। অথচ শহরে তাকে একজন ভালো মানুষ হিসেবে সবাই পছন্দ করতো। তিনি অন্তত তাদের মধ্যে ছিলেন না, যাদেরকে পুলিশ সন্দেহের তালিকায় রেখেছিল। শেষমেশ নিজের মেয়ের কল্যাণেই তিনি প্রথম পুলিশের সন্দেহের তালিকায় আসেন। এবং এরপরেও তাকে গ্রেপ্তার করতে পাঁচ বছর সময় লেগেছিল পুলিশের। চার সন্তানের মাও যে কাউকে খুন করতে পারে, এই ধারণাটি কর্তৃপক্ষের মাথায়ই আসেনি।

জনসনের মতে, অপরাধের পর তদন্তকারীর চোখে ধুলো দেওয়ার ক্ষেত্রে সাইকোপ্যাথরা খুবই দক্ষ। সামনাসামনি দেখতে তারা প্রায়শই নম্র ও আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী। মূলত এটিই তাদেরকে আরও বেশি বিপজ্জনক করে তোলে।

এসব অপরাধীদের দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর তাদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার ৩০ বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে জনসনের। সেই অভিজ্ঞতার আলোকের তিনি বলেন, “তারা (সাইকোপ্যাথরা) আমাদের চেয়ে অনেক বেশি বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন।”

সূত্র: ডিসকভার ম্যাগাজিন