সময় যেখানে পিছুটানে


sujon প্রকাশিত: ৪:৩১ অপরাহ্ণ ১১ মার্চ , ২০২২
সময় যেখানে পিছুটানে

মো. হুমায়ুন কবির: সাগরকন্যা তুমি মিশেছো দিগন্তে, কিন্তু মেশোনি আকাশের সাথে। তোমার তোলপাড় করা রুপ মুগ্ধ করেছে বারংবার। কবির এই অনুভূতির মতোই বিমোহিত হবেন সাগরকন্যার সৌন্দর্যে।

হঠাৎই পরিকল্পনা করা হয় আমরা কয়েকজন শিক্ষক মিলে কুয়াকাটার উত্তাল সাগরের ঢেউ দেখতে যাব। সবাই আলোচনা করে দিন তারিখ ঠিক করে ফেললাম, ১২-ই এপ্রিল, মঙ্গলবার। একটি মাইক্রোবাস ভাড়া নিয়ে বিকাল পাঁচটায় রওনা দিই কুয়াকাটার উদ্দেশে। রাত্র তখন তিনটা আমরা পৌছে যাই কুয়াকাটার সুমদ্রে বীচে।

আশে পাশে কোন দর্শনার্থী নেই শুধু আমরা কয়েকজন আর সুমদ্রের একটানা বাঁধভাঙ্গা গর্জন। সবাই আমরা ক্লান্ত পথিক, বিশ্রামের জন্য গা এলিয়ে দিলাম সুমদ্রের বীচে রাখা বিনা পয়সার খাটের উপর, কারন খাটের মালিক তখনো পৌছায়নি। আমাদের সিনিয়র শিক্ষক তরিকুল স্যার বেঘোর ঘুমে নাক ডাকতে শুরু করে দিয়েছেন।

তখনো আমরা ভোরের অপেক্ষায়!

ইতোমধ্যে দুই একজন আমাদের কাছে আসতে শুরু করেছে, তারা আমাদের গাইড হিসাবে কাজ করতে চায়। দর কষাকষির মাধ্যমে ছয়টি মোটরসাইকেল ভাড়া নিয়ে ছুটে চললাম সূর্যদয়ের দৃশ্য দেখতে। মোটরসাইকেল বহর দেখে তাদের কৌতূহলের শেষ নেই। সুমদ্র সৈকতে চললো আমাদের এক ঘন্টার বাইক রেস। ছোট একটা খাল পেরিয়ে পৌছিয়ে গেলাম সাগর তীরে। কিন্তু বিধিবাম সুমদ্রের বুকচিরে কীভাবে সূর্যদয় ঘটে, তা আর দেখা হলোনা মেঘের কারনে। শুরু হলো আমাদের ফটোসেশন। সেখান থেকে চলে এলাম লাল কাঁকড়ার দ্বীপে। লাল লাল বেশ বড় সাইজের কাঁকড়ার দেখা মিলল সেই দ্বীপে। একে একে আমরা গঙ্গাচর, ঝাউবন,ছোট এক চিলতে নদী দেখতে লাগলাম। ঝাউবনের পাশে সুমুদ্রের তীরে বসবাসরত এক বৃদ্ধ’র সাথে পরিচয় হলো।

তার কাছ থেকে আমরা অনেক কিছু জানতে পারলাম। সেও মানিক বন্দোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস পদ্মানদীর মাঝির নায়ক কুবের মত। অন্যের জাল ভাড়া নিয়ে সমুদ্রের বুকে মাছ ধরে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে তিন ভাগের এক ভাগ অংশীদারিত্বে মাধ্যমে। আমাদের সহকারি প্রধান শিক্ষক তাকে কিছু টাকা দিতে চাইলে সে নির্বিকার হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে হাত বাড়িয়ে টাকাটা নেয়। চোখের কিনারায় নেমে আসে সমুদ্রের ঢেউয়ের মত উচ্ছসিত অশ্রুরাশি।

সেখান থেকে বিদায় নিই। এরপর শুরু হয় নতুন দর্শনের অভিযান। রাখাইন মিস্ত্রিপাড়ার রাখাইনদের তৈরী হাতের কারুকার্য শিল্পের নিদর্শন পর্যবেক্ষন করে ফিরে এলাম একটা বৌদ্ধমন্দিরের পাশে। পঁয়ত্রিশ ফুট উচু বিশাল আকৃতির বুদ্ধমূর্তি। যেটাকে আমরা গৌতম বুদ্ধের ধর্ম অনুসারি বলি। পাশেই দেখলাম একটি প্রতিষ্ঠান ‘লোকাসুখ বৌদ্ধবিহার দরিদ্র ছাত্র উন্নয়ন ফাউন্ডেশন’ নামে। এটি গড়ে ওঠেছে জ্ঞানের আলোর প্রদীপ হিসাবে।

এই সেবা পরিচালনা করে উত্তম ভিক্ষুক নামে একজন ধর্মযাজক। রাখাইন ছেলে মেয়েরা এই স্কুলে লেখাপড়া করে। মোটরবাইকে আবার যাত্রা শুরু ছুটে চলি এলাকায় পরিচিত স্বর্ণ মন্দিরের দিকে যেখানে রয়েছে আরও একটি প্রাচীন কুপের নিদর্শন। প্রাচীন নিদর্শনের উপর ভিত্তি করেই এই এলকার নামকরন করা হয়েছে কুয়াকাটা। ওখানেই দেখলাম আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে রাখাইন ছেলে মেয়েরা তাঁত বোনে। আমরা ফিরে আসলাম আমাদের ভাড়া করা আবাসিক হোটেল স্বপ্নবিলাসে। সূর্য তখন মাথার উপরে। সবার পেটে ভাটার টান পড়েছে। ভাটার টান জোয়ারে প্লাবন করতে ঢুকে পড়লাম রেস্টুরেন্টে।

টানা দুই ঘণ্টা বিশ্রামের পর এবার আমাদের মিশন ফাতরার চর। এটি একটি সুন্দরবনের বিচ্ছিন্ন অংশ। শুনেছি এখানে কেওড়া গেওয়া-গরান সুন্দরী বাইন গোলপাতা ইত্যাদি দেখতে পাওয়া যায়। আমাদের মধ্যে একজন অসুস্থ হয়ে পড়ায় যাওয়া আর হল না। ফিরে আসলাম স্বপ্নবিলাসে। সবার চোখে তখন রাজ্যের ঘুম। বেডে শরীরটা এলিয়ে দিয়ে সিনিয়র শিক্ষকরা ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গেল। আমরা যারা জেগে ছিলাম, সিদ্ধান্ত নিলাম এখনি সাগরে নামবো। কেউ কেউ রাজি হল না।

এর মধ্যে আমাদের আতিয়ার স্যার বলে ওঠলো সাগরের পানি দেখলে আমার ৭৫% জানে পানি থাকে না। তাকে আমরা আর বেশি ঘাটলাম না। আমরা কয়েক জন সাগরে নামার জন্য প্রস্তুতি নিলাম। সুমদ্রের কাছে যেতেই সৈকতের সৌন্দর্য অন্যমাত্রায় নিয়ে আমাদের কাছে হাজির। সাগরের হাতছানি এড়াতে না পেরে ঝাপিয়ে পড়লাম উত্তাল সাগরের বুকে। সাগরের শীতল পানি যখন শরীরে লাগে, শিহরিত হয় গায়ের লোমকূপ।

এর মাঝে দেখা হয় ফটোগ্রাফারের সাথে। ছবি তুলতে থাকি একের পর এক। সব কিছু বিলীন হয়ে যায় মিথস্ক্রিয়ায়। হারিয়ে যায় নাগরিক ইট পাথর আর বড় বড় গল্পগুলো। প্রথমে হাঁটু পানি তারপর গলা পানিতে নামতে শুরু করে সবাই। সাগরের ঢেউ শরীরের এসে আছড়ে পড়ার অনুভূতিটা একে বারেই আলাদা। ঢেউগুলো কখনো খুব গভীরে আবার কখনো তীরের দিকে ঠেলে দেয় অভিমান কিশোরির মত।

জীবন যুদ্ধে যত দ্বিধা সংকোচ সব কিছু প্রকাশ পায় অনাবিল উত্তল ঢেউ এ। দুদিন সফর শেষে আমরা গন্তব্য এর পথে। শরীরটাই কেবল ছিল মাইক্রোবাসে আর আত্মা ছিল সাগর কন্যায়। স্মৃতিগুলো মিলেমিশে একাকার মেঘ সমুদ্রে বন্ধুতে। রাত বাড়ে সমুদ্রের দুরাত্বের সাথে, তখনো কোথাও ঢেউগুলো আছড়ে পড়ছিল চোখের অনাবিল ঘুমে………………