সরকারি চাকরির প্রলোভনে ২ কোটি টাকা আত্মসাৎ


sraboni প্রকাশিত: ৯:০২ পূর্বাহ্ণ ২৫ ফেব্রুয়ারি , ২০২২
সরকারি চাকরির প্রলোভনে ২ কোটি টাকা আত্মসাৎ

নিজস্ব প্রতিবেদক : মাস্টার্স পড়ুয়া মো. সাজু মিয়া (২৮) রাইড শেয়ারিং করে নিজের ও পরিবারের খরচ বহন করতেন। নিজের মোটরসাইকেলের কিছু সমস্যা সমাধানে রাজধানীর দক্ষিণখান এলাকার একটি মেকানিকের দোকানে মাঝেমধ্যেই যেতেন। সেই দোকানের মেকানিকের মাধ্যমে পরিচয় হয় বিজিবির ভুয়া সদস্য সামসুজ্জোহা ওরফে জুয়েলের সঙ্গে।

বিজিবি থেকে প্রেষণে র‌্যাবে কাজ করছেন জানিয়ে জুয়েল সাজুকে চাকরির প্রলোভন দেখান। বিশ্বাস অর্জনের জন্য সাজুর সঙ্গে জুয়েল চক্রের অন্য সদস্যদের সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা পরিচয়ে সাক্ষাৎ করান। এভাবে আস্থা অর্জন করে ভুয়া চাকরি নিয়োগপত্র দিয়ে সাজুর কাছ থেকে প্রায় সাড়ে ১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি।

জুয়েলের ব্যবহার আর চলন-বলনে মুগ্ধ হয়ে চাকরির আশায় টাকা দিয়েছেন জানিয়ে সাজু বলেন, একটা চাকরির আশায় বাড়ি, ঘর, জমি ও গোয়ালের গরু বিক্রি করে জুয়েলকে টাকা দিয়েছি। কিন্তু তিনি আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছেন।বুধবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) রাতে ওই প্রতারক চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-১। রাজধানীর দক্ষিণখান থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতাররা হলেন- মো. সামসুজ্জোহা ওরফে জুয়েল (৪০), শামীম হাসান তালুকদার (৩৮) ও আলমগীর হোসেন (৪০)।

গ্রেফতারের সময় তাদের কাছ থেকে সেনাবাহিনীর একটি ভুয়া পরিচয়পত্র, বিজিবির দুইটি ভুয়া পরিচয়পত্র, তিনটি ভুয়া নিয়োগপত্র, ১৬ পাতা ব্যাংক স্টেটমেন্ট, একটি ব্যাংক চেক ও প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত ছয়টি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়।

র‌্যাব বলছে, জুয়েলের নেতৃত্বে চক্রটি চাকরি দেওয়ার নামে অর্ধশতাধিক মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। যাদের বেশিরভাগই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র মানুষ। ভালো চাকরির আশায় নিজেদের সর্বস্ব বিক্রি করে প্রতারক চক্রের হাতে লাখ লাখ টাকা তুলে দিয়েছেন তারা।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন র‌্যাব-১ এর অধিনায়ক (সিও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল আব্দুল্লাহ আল মোমেনবৃহস্পতিবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়। র‌্যাব-১ এর অধিনায়ক (সিও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল আব্দুল্লাহ আল মোমেন এসব তথ্য জানান।

তিনি বলেন, কয়েক বছর ধরে সামসুজ্জোহা ওরফে জুয়েল দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে চাকরি প্রত্যাশী ও তাদের পরিবারের সঙ্গে সুকৌশলে পরিচিত হন। পরিচয়ের সূত্র ধরে জুয়েল তার পরিচিত কয়েকজন ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তার মাধ্যমে সেনাবাহিনী ও বিজিবিতে চাকরি দিতে পারবেন বলে জানান। ভুক্তভোগীদের সরলতার সুযোগ নিয়ে কৌশলে বিশ্বাস অর্জন করে একপর্যায়ে সেনাবাহিনী, বিজিবিতে অফিস সহকারী, বাবুর্চি, কেরানি, মেসওয়েটারসহ বিভিন্ন বেসামরিক পদে চাকরির জন্য পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকা করে নেন।

এরপর চাকরিপ্রার্থীদের মেডিকেল চেকআপ করার কথা বলে সেনাকর্মকর্তার সহকারী (পিএ) পরিচয় দেওয়া আলমগীর হোসেনের মাধ্যমে চক্রের অপর সদস্য সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা পরিচয়দানকারী শামীম হাসান তালুকদারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করাতে ঢাকা সেনানিবাস সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যেতেন। এতে চাকরিপ্রার্থীরা বিশ্বাস ও আস্থা পেতেন। পরবর্তীতে প্রতারক চক্রের সদস্যরা ভুয়া নিয়োগপত্র দিতেন। যাতে সেনাবাহিনী, বিজিবির মনোগ্রাম সম্বলিত বেসামরিক পদে চাকরির নিয়োগপত্র শিরোনাম লেখা থাকতো। এরপর এই নিয়োগপত্র নিয়ে সেনানিবাসে গেলে ভুক্তভোগীদের বলা হয়- ‘এটা ভুয়া নিয়োগপত্র।’

গ্রেফতার চক্রের সদস্যদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে লেফটেন্যান্ট কর্নেল আব্দুল্লাহ আল মোমেন বলেন, সামসুজ্জোহা ওরফে জুয়েল এই চক্রের মূলহোতা। জুয়েলের বিরুদ্ধে অস্ত্র, নারী নির্যাতন, প্রতারণা ও মাদকসহ দেশের বিভিন্ন থানায় ৮টি মামলা রয়েছে। যার মধ্যে তিনটিতে তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে। ২০১৫ সালের দিকে চক্রের অপর দুই সদস্যের আলমগীর ও শামীমের সঙ্গে তার পরিচয় হয়।

তারা দুজনেই কম্পিউটার প্রিন্ট ও ফটোকপি দোকানের মালিক। তাদের দোকানে অনলাইনে চাকরির জন্য আবেদন করতে আসা ব্যক্তিদের মাধ্যমেই বিভিন্ন বাহিনী ও সরকারি চাকরির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির তথ্য সংগ্রহ করতেন। সেখান থেকেই তারা চাকরিপ্রত্যাশীদের টার্গেট করতেন।

তিনি আরও বলেন, শামসুজ্জোহা ওরফে জুয়েল শুরু থেকেই নিজেকে বিজিবির সদস্য (হাবিলদার মেডি. অ্যাসিস্ট্যান্ট) হিসাবে ভুয়া পরিচয় দিয়ে আসছিলেন। এই চক্রটি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের হতদরিদ্র পরিবারের লোকদের সরকারি চাকরির মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতারণা করে আসছিল। চক্রটি অর্ধশত মানুষের কাছ থেকে দুই কোটিরও বেশি টাকা আত্মসাৎ করেছে।