সিলেট অঞ্চলের সাম্প্রতিক বন্যা: একটি ভৌগোলিক আলোচনা


resma প্রকাশিত: ৫:৩৫ অপরাহ্ণ ১৯ জুন , ২০২২
সিলেট অঞ্চলের সাম্প্রতিক বন্যা: একটি ভৌগোলিক আলোচনা

ড. মোহাম্মদ আবু হাসান ফারুক: সম্প্রতি সিলেট অঞ্চলের আকস্মিক বন্যায় এ অঞ্চলের সুনামগঞ্জ (প্রায় ৮৯%), সিলেট (প্রায় ৭২%), হবিগঞ্জ (প্রায় ৭০%) এবং মৌলোভী বাজারের (প্রায় ৫০%) বিশাল এলাকা প্লাবিত হয়ে যায়। ফলে এ অঞ্চলের মানুষের জান ও মাল নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে। মানুষের স্বাভাবিক জনজীবন হয়ে পড়েছে বিপন্ন। প্রতিবছর বর্ষার সময় এ দেশের স্বাভাবিক বন্যায় ২০ হতে ৩০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হলেও এবারের বন্যা ভয়াবহতার সৃষ্টি করেছে। স্বাভাবিকভাবে বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টি ও নদীর উচ্চ অববাহিকা জলাধারের (upper catchment area) অতিরিক্ত পানি প্রবাহের কারনে দ্রুত অস্বাভাবিক জলের বৃদ্ধি এরূপ অবস্থার সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ পানির বৃদ্ধি জনজীবনের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও সম্পদের ক্ষতির কারন হয়। সিলেট অঞ্চলে এরূপ আকস্মিক বন্যা বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়। এবারের এ ভয়াবহ বন্যা দুই হাজার চার সালের এ অঞ্চলের বন্যাকে মনে করিয়ে দেয় সবাইকে।

বন্যা ও বাংলাদেশ: ভৌগোলিক অবস্থানগত কারনে নদীমাতৃক বাংলাদেশের মানুষের সাথে এদেশের খাল-বিল, নদী-নালা ও মাটির একটা নাড়ীর সম্পর্ক। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা নদীবাহিত বিলিয়ন বিলিয়ন টন পলি, নুঁড়ি, পাথরকনা, বিভিন্ন ধরনের শিলা ও খনিজ সঞ্চয়নের ফলে সৃষ্ট পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ, এদেশের নদী-নদী, হাওড়-বাওড়, বিল-ঝিলের জলাবদ্ধতা ও দেশের উত্তর-পূবাংশ, দক্ষিন-পূর্বাংশের দন্ডায়মান পাহাড়ের সারি, উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাংশের ভারত ও নেপালে দন্ডায়মান হিমালয় পর্বতশ্রেনীর অবস্থান এ অঞ্চলটিকে ক্রান্তীয় অঞ্চলের একটি বৃষ্টিবহুল দেশে পরিনত করেছে। কাজেই অতিবৃষ্টির কারনে এদেশের নদী-নদী দু’কুল ছাপিয়ে প্রায় প্রতিবৎসরই দেশের প্রায় ২০-৩০ শতাংশ ভুমি প্লাবিত করে ফেলে। আর প্লাবন শেষে জলাবদ্ধতা রেখে যায় প্লাবন সমভূমিতে পললের আস্তরন। এভাবেই নদী বিধৌত বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের সাথে বৃষ্টিপাত, প্লাবন , বন্যা ও নদী-নদীর সাথে সহ-অবস্থান সুপ্রাচীন কাল হতেই এদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির সাথে ওতোপ্রোত ভাবে মিশে গেছে। তদুপরি, অধিক বৃষ্টিপাত ও জলাবদ্ধতা যখন বিপদসীমা ছাড়িয়ে জান ও মালের ক্ষতির কারন হয়ে দেখা দেয়, তখন মানুষের জীবনে নেমে আসে দূর্ভোগ ও দূর্দশা। বন্যার পানি ভাসিয়ে নিয়ে যায় মানুষ, পশু, সম্পদ। ক্ষতিগ্রস্থ হয় রাস্তা-ঘাট, ব্রীজ ও দেশের অবকাঠামোগত অবস্থা।

বন্যার প্রকৃতি: বাংলাদেশে উৎস ভিত্তিতে চার প্রকারের বন্যা দেখা যায়: ক) আকস্মিক বন্যা, খ) অতি বৃষ্টিজনিত বন্যা, গ) ঘূর্ণিঝড় জনিত বন্যা এবং ঘ) মৌসুমী বন্যা। এ চার প্রকার বন্যা দেশের চারটি অঞ্চলে দেখা যায়। আকস্মিক বন্যা হয় পাহাড়ী অঞ্চলে, বৃষ্টিপাত জনিত বন্যা হয় নিম্নাঞ্চলে, ঘূর্ণিঝড় জনিত বন্যা উপকূলীয় অঞ্চলে এবং মৌসুমী বন্যা হয় দেশের সমগ্র প্লাবন সমভূমিতে।

সিলেট অঞ্চলের আকস্মিক বন্যা: উচ্চ পাহাড়ী অঞ্চলে অধিক বৃষ্টিপাতের ফলে পাদদেশীয় অঞ্চলে বন্যার পানির মাত্রা স্বল্প সময়ের ব্যবধানে দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং একই ভাবে দ্রুত বন্যা হ্রাস পায়। এধরনের বন্যায় ব্যাপক ফসল ও জান-মালের ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়। বাংলাদেশে এপ্রিল হতে সেপ্টেম্বরে এরকম বন্যা দেখা যায়। বাংলাদেশে এই প্রকারের বন্যা সাধারণতঃ উত্তর-পূর্ব, উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের নদী অববাহিকা অঞ্চলসমূহঃ করতোয়া, সুরমা, ধলেশ্বরী, কংস, তিস্তা, কুশিয়ারা, মনু, খোয়াই, গোমতি, কর্ণফুলী, হালদা সাংগু প্রভৃতি নদীর অববাহিকায় দেখা যায়।

বাংলাদেশে বন্যার প্রকৃতি : গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র -মেঘনা নদী দ্বারা সৃষ্ট পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ বাংলাদেশ জলাবদ্ধতা এবং অতি বৃষ্টিপাতের ফলে প্লাবিত হয় প্রায় প্রতিবৎসরই। বন্যা বাংলাদেশে একটা পুনরাবৃত্তিশীল ঘটনা। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমেী এদেশের প্রায় ২০ শতাংশ এলাকা স্বাভাবিক বন্যা প্লাবিত হয়। ১৯৫৪-১৯৮৭ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে প্রায় এক ডজন ভয়াবহ বন্যা এদেশের ৩৫,০০০-৫৫,০০০ বর্গ কিঃমিঃ এলাকা মারাত্মকভাবে প্লাবিত করেছে। এতে জান-মালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু ১৯৮৮ সালের বন্যা রেকর্ড পরিমাণ অর্থাৎ ৯৮,৩৩৩ বর্গ কিঃ মিঃ (সমগ্র দেশের ২/৩ অংশ) এলাকা জলমগ্ন করেছে। বন্যাজনিত কারনে এদেশে বাৎসরিক ক্ষতির পরিমান আনুমানিক আট’শ কোটি টাকা। ১৯৮৮ সালের বন্যায় দেশের মোট ৬৪টি জেলার ৫৩ টি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং মোট ক্ষতির পরিমান ছিল প্রায় ৫০০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য: বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। সেক্ষেত্রে বন্যাজনিত সকল দুঃখের মূল এখানেই। প্রায় সাড়ে তের কোটি বছর পূর্বে হিমালয় পর্বতের উৎপত্তির সাথে, এর দক্ষিণ ভাগে পূর্বে আসাম হতে পানি বয়ে পাকিস্তানের কাটোয়া পর্যন্ত বিস্তৃত এক গভীর সম্মুখ খাতের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে প্রাচীন নদীসমূহের বাহিত বালি দ্বারা এখাত পূর্ণ হয়। এ সমস্ত নদী পববর্তীতে সিন্ধু,গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র এ প্রধান তিন নদীতে পরিণত হয় কয়েক পর্যায়ে ভু-আলোড়নের ফলে ভূ-পৃষ্ঠের উত্থান-পতন হয় এবং পরিশেষে ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গা বাহিত সম্মিলিত পলল দ্বারা বর্তমান বাংলাদেশ গঠিত হয়। ভূতাত্ত্বিকগণ একে বঙ্গেয় অবখাত হিসাবে আখ্যা দিয়েছেন। এর অবখাতের উত্তরে গারো পাহাড়, পূর্বে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়, পশ্চিমে রাজমহল পাহাড় ও দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর সমুদ্রের দিকে খোলা প্রাকৃতিক গামলার মত এ নিম্নভূমির গড় উচ্চতা মাত্র ২৫০ ফুট। এ বিশাল নিম্নভূমি সমতলভূমি বর্ষকালে প্লাবিত হয়ে যায়, যা প্রায় ১৫,০০০ মাইল জলপথ দ্বারা বিধৌত। তবে গঙ্গা এ ব্রহ্মপুত্র মোহনা বর্ষাকালীন জলাধার বললে বাড়িয়ে বলা হয় না।

বন্যার ক্ষয়ক্ষতি: বাংলাদেশের প্রতিবৎসর স্বাভাবিক বন্যার গ্রায় ২৮ হাজার বর্গ কিঃ মিঃ এলাকা প্লাবিত হয়ে থাকে। স্বাভাবিক বন্যা বাংলাদেশের মৃত্তিকার উর্বরতা দান ও মাছের আধার বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সহায়ক হলেও অতিরিক্ত বন্যা মানুষের জান ও মালের ক্ষতির কারন হয়ে দেখা দেয়, নেমে আসে বিপর্যয়। ১৯৫৪ সাল হতে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বন্যার প্রকৃতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, এর মধ্যে ৬টি মাঝারী, ৬টি মারাত্বক, ৪টি অত্যন্ত মারাত্বক এবং ১টি ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে ১৯৮৮ সালের বন্যায় বাংলাদেশের প্রায় ৮৪ ভাগ এলাকায় জলের নীচে চলে যায়।

২০০৪ সালে সিলেট মহানগরী আঞ্চলিক বন্যায় কবলিত হয়ে পড়ে এবং প্রায় দুই শত কোটি টাকার জিনিসপত্র ও জান-মালের ক্ষয়-ক্ষতির কারণ হয়ে দেখা দেয়। সিলেটের উপশহরস্থ প্রায় প্রতিটি বাড়ীর নীচ তলাতে পানির অবাধ প্রবেশ সম্পদের বিপুল ক্ষতি সাধন করে থাকে। বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, টেলিফোন, যোগাযোগ প্রভৃতি নগরীর সুযোগ সুবিধা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মানুষ অত্যন্ত শংকিত ও ভয়াবহ অবস্থায় জীবন যাপন করে। ময়লা-মাটি, বর্জ্য পদার্থসমূহে রস্তাা-ঘাট ভরে যায়। রাস্তার-রাস্তায় রিকসার পরিবর্তে দেখা দেয় নৌকা। শরীরের বিভিন্ন স্থানে ক্ষত সৃষ্ট হওয়াসহ, পেটের পীড়া, আমাশয় প্রভৃতি রোগে আক্রান্ত হয়ে উঠে অনেকে। তদুপরি, ছোট-ছোট ছেলে-মেয়েদের জন্য বন্যা কবলিত পরিবেশে আরো ভয়ংকর হয়ে দেখা দেয়। অনেকে বাসা ছেড়ে নৌকায় কিংবা পোটলা কাঁধে যাত্রা শুরু করে গ্রামের পথে। জনজীবন হয়ে ওঠে বিপন্ন। সাহায্যের নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির ছবির ছড়া-ছড়িতে ভরে ওঠে পত্রিকার পাতা। সিলেট অঞ্চলের এবারের বন্যার প্রকৃতি ও ক্ষয়ক্ষতি আগের মতোই ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি করেছে। আমাদের সুশীল সমাজকে বন্যা, বন্যায় কারন এবং এর প্রতিকার সম্পর্কে ভাবতে হবে এবং এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহন করতে হবে।

সিলেট অঞ্চলে বন্যা সৃষ্টির কারনসমূহ:

অতিবৃষ্টি: বাংলাদেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাংশে অবস্থিত ভারতের মেঘালয় ও আসাম পৃথিবীর বৃষ্টিবহুল স্থানসমূহের মধ্যে অন্যতম। এসব স্থানে বৎসরে প্রায় ১৩০০ সেঃ মিটারের অধিক বৃষ্টিপাত সংঘটিত হয়, এমনকি এক ঘন্টায় ১০০ সেঃ মিটারেরও অধিক বৃষ্টিপাত সংঘটিত হয়ে থাকে। তদুপরি, এসব স্থান বাংলাদেশের সীমানার খুব কাছে এবং উচ্চ ঢালে অবস্থিত হওয়ায় বৃষ্টির পানি সুরমা ও কুশিয়ারা দিয়ে সহজেই নিম্নপ্রবাহে সিলেটাঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়। একই সময়ে বাংলাদেশের অন্যান্য নদীগুলোও অধিক বৃষ্টিপাতের কারনে নদীখাতসমূহ প্রায় পূর্ন থাকে। বিশেষ করে সুরমা-কুশিয়ারা-কালনী নদীর পানির বাহক মেঘনায়ও যথেষ্ট পানি পূর্ন থাকে। ফলে এ অঞ্চলের পানি নিস্কাশন ব্যাহত হয়। তদুপরি, প্রতিদিনের বৃষ্টির পানি ক্রমেই জলাবদ্ধতা ও পানির উচ্চতা বৃদ্ধি করে সমভুমি ও শহরাঞ্চলে প্রবেশ করে এবং জান-মালের ক্ষতি সাধন করে থাকে।

বৃক্ষকর্তন: মেঘালয়, আসাম, মিজোরামের বরাক-সুরমা-কুশিয়ারার উচ্চ ঢালে মনুষ্য প্রজাতির হস্তক্ষেপে অপরিকল্পিত বৃক্ষকর্তনের ফলে সহজেই বৃষ্টির পানি নিম্ন ঢাল অনুসরণ করে নিম্ন প্রবাহে প্রবাহিত হয়। এছাড়া বৃক্ষ নিধনের কারনে উচ্চ ঢালের মৃত্তিকার উপরিস্থিত (top soils) বিভিন্ন ধরনের খনিজ ও হালকা ঝুরঝুরে মৃত্তিকাকণা নুঁড়ি, পাথর সহজেই বৃষ্টির জলধারার সাথে নিম্ন প্রবাহে প্রবাহিত হয়ে বরাক-সুরমা-কুশিয়ারা নদীখাতকে ( river bed) ভরাট করে ফেলে। ফলে নদীখাতের পানি ধারন ক্ষমতা হ্রাস পায়। কাজেই বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের ফলে সৃষ্ট পানি নিস্কাশন ব্যাহত হয় এবং বন্যার সৃষ্টি হয়ে থাকে। ইতোমধ্যেই সুরমা ও কুশিয়ারার (সীমানা নির্ধারণকারী নদী) বুকে জেগে ওঠা চর এদেশে সচেতন মানুষ ও বিশেষজ্ঞদেরকে বিব্রত ও দুশ্চিন্তাগ্রস্থ করে তুলেছে। তদুপরি, আসামের বরাক নদীর উপরে টেপাইমুখে ভারতের প্রবাহিত বাঁধ প্রকল্পের বাস্তবায়ন সম্পূর্ন হলে ভারতের আসাম, মিজোরাম, মেঘালয়সহ সিলেটাঞ্চলে বন্যার ভয়াবহতা বৃদ্ধি, ভূতাত্ত্বিক অস্থিরতা বৃদ্ধি, ভূ-কম্পন প্রবনতার বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন প্রকার প্রাকৃতিক দূর্যোগের সম্ভাবনা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে।

ভূতাত্ত্বিক অস্থিরতা: ভূ-কম্পনের ফলে ভূ-পৃষ্টের ভূমিরূপ পরিবর্তনের মাধ্যমে নদীর গতিপথের পরিবর্তন ও নিমজ্জন ঘটতে পারে। এছাড়া একইভাবে ভূ-অভ্যন্তরের শিলাস্তরে বিস্ফোরনের ফলে ভুপৃষ্ঠের জলধারার মধ্যে ভূ-আলোড়নও ঘটতে পারে। ১৯৮৮ সালের বন্যার কারনে হিসাবে অনেকেই একই সালের ৬ আগষ্টে ভূমিকম্পের মাধ্যমে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার জলনিস্কাশনকে আলোড়িত করায় বিষয়কে বিশেষ ভাবে দায়ী করে থাকে।

পাহাড় ও টিলাকর্তন: সুরমা ও কুশিয়ারার অববাহিকা সংলগ্ন অঞ্চলে বিশেষ করে জনবসতিপূর্ন শহরাঞ্চলে পাহাড় ও টিলাকর্তনের মাধ্যমে বাংলো, এপার্টমেন্ট হোটেল, মোটেল, পার্ক, রিয়েল স্টেট প্রকল্প প্রনয়ন প্রভৃতির মাধ্যমে অপরিকল্পিত ভাবে মনুষ্য অবিবেচক প্রজাতির প্রানীর হস্তক্ষেপে ভূমিরূপের পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে। ফলে পাহাড় ও টিলা নির্ধনের সাথে-সাথে বৃক্ষকর্তনের ফলে উপরের হালকা মৃত্তিকা সহজেই বৃষ্টিধারার সাথে নদীতে গিয়ে জমা হয়ে নদীর তলদেশ (river bed) ভরাট করে ফেলে এবং নদীর পানি ধারন ক্ষমতা হ্রাস পায়। কাজেই এসব কারনে সিলেটাঞ্চলে ভুমিকম্পন প্রবনতা বৃদ্ধির সাথে সাথে বন্যা সৃষ্টির অন্যতম কারন হিসাবে দেখা দিচ্ছে।

মোহনা জোয়ার: প্রতিবৎসর বর্ষাকালে পদ্মা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র বিপুল পরিমান জলরাশি বহন করে মেঘনার মোহনা দিয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পতিত হয়। কিন্তু এ সময়ে নদী মোহনায় বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট জোয়ারের চাপ নদীর পানির চাপের চেয়ে পাঁচগুন অধিক থাকে। ফলে পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র, সুরমা-কুশিয়ারা-কালনীর অতিরিক্ত পানি নদী মোহনা দিয়ে সহজেই নিস্কাশিত হতে পারে না এবং উজানের অঞ্চলসমূহ এমনকি সিলেটাঞ্চলের বন্যার প্রবনতা বৃদ্ধি পায়।

আঁকা-বাঁকা নদী: সুরমা-কুশিয়ারা-কালনী নদী আঁকা-বাঁকা ও সপিল প্রকৃতির (meandering) নদী বৈশিষ্ট্যের অন্যতম। কাজেই নদীবাহিত পানি নদীর বাঁকে বাঁধা প্রাপ্ত হয়ে নদী পাড় (river bank) ছাপিয়ে সমভুমিতে প্রবেশ করে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত করে ফেলে, যা অনেক ক্ষেত্রে জান ও মালের ক্ষতির কারন হয়ে দেখা দেয়।

নদী ভরাট: বাংলাদেশের বন্যার কারন হিসাবে অপরিকল্পিত বৃক্ষকর্তন, পাহাড়-পর্বত নিধন, খাল-খননের হালকা মৃত্তিকা নদীগর্ভে সঞ্চয়ন, শহরের বর্জ্য সঞ্চয়ন, শিল্প কল-কারখানার পরিত্যক্ত দ্রব্রাদির সঞ্চয়ন প্রভৃতি কারনে দেশের নদীগর্ভ ভরে গেছে। তদুপরি, সুপরিকল্পিত জল নিস্কাশন ব্যবস্থার অভাবে আকস্মিক বন্যার ফলে সমূহ বিপর্যয়ের সম্মুখিন হওয়ার সম্ভবনা দেখা দিচ্ছে এবং এ ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় অতিরিক্ত বৃষ্টি পাতের উপর নির্ভর করে প্রায় প্রতিবৎসরের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনাতে পরিনত হতে পারে।

বন্যা নিয়ন্ত্রন: বাংলাদেশ অবস্থানগত ভাবেই বন্যাপ্রবন এলাকার অবস্থিত। কাজেই কম-বেশি বন্যা সিলেটাঞ্চলের জন্য একটি সাধারন ঘটনা। সুরমা-কুশিয়ারা-কালনীর উৎস যেহেতু ভারতে অবস্থিত। কাজেই আমাদের সরকার প্রধানদেরকে ভারত সরকারের সাথে আলাপ-আলোচনা ও সমাঝোতার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক নদী হিসাবে এর উচ্চ অববাহিকা অঞ্চলে বৃক্ষরোপন এবং পাহাড়ের ঢালে জলাধারা সৃষ্টির মাধ্যমে অতিরিক্ত জল আটকে রেখে বন্যার প্রবনতা হ্রাস করতে হবে। নদীর উপর কোন প্রকারের বাঁধ নির্মান করা যাবে না, যাতে নদীর বৈরি আচরন ও নদীখাতে পলল সঞ্চয়নের মাধ্যমে ভরাট হয়ে অতিরিক্ত পানি বহনে অক্ষম হয়ে পড়ে। দেশের সচেতন, সুশীল সমাজকে বৃক্ষকর্তন ও পাহাড় টিলা কর্তনের মাধ্যমে দেশকে ভূমিকম্পের হুমকির সম্মুখিন হতে রক্ষা করা এবং নদী ভরাটের হাত হতে রক্ষ করতে হবে। নদীর বুকে জেগে ওঠে চরসমূহ ড্রেজিং-এর মাধ্যমে অপসারন করে নদী জল নিস্কাশনের সুষ্ঠ অবস্থা সৃষ্টি করতে হবে। সুশীল ও সচেতন মহলকে এয়ার কন্ডিশন (air conditioner), ফ্রিজ, শিল্প, কল-কারখানা, গাড়ীর মাধ্যমে উৎপন্ন (CO2, CFC) প্রভৃতি গ্যাস উৎপাদন রোধ করে পরিবেশ দূষণরোধ করার মতো যথেষ্ট বিচক্ষন ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে এবং পৃথিবীর উষ্ণায়ন প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রন করে উচ্চ অক্ষাংশের বরফ গলার মাধ্যমে অতিরিক্ত জল সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে হবে। নদী পাড়গুলো বাঁধের মাধ্যমে উঁচু করে তুলতে হবে।

বন্যা একটি প্রাকৃতিক দূর্যোগ। অবস্থানগত কারনে আমাদের জীবনযাত্রা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বন্যার সাথে সম্পৃক্ত। একদিকে যেমন বন্যাহীন বাংলাদেশ মরুভুমির দিকে ধাবিত হবে, অন্যদিকে বন্যার ভয়াবহতা এদেশের মানুষের জান-মালের ক্ষতির কারণ হয়ে দেখা দেবে। কাজেই সুষ্ঠ পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ গ্রহন করে বন্যাকে নিয়ন্ত্রনের মাধ্যমে বন্যার সাথে খাপ-খাওয়ে এদেশের মানুষের জন্যে উপযোগী একটা অবস্থা সৃষ্টির ক্ষেত্রে সমূহ ব্যবস্থা গ্রহন অত্যন্ত আবশ্যক। বাংলাদেশ নদী-মাতৃক দেশ। নদী বিধৌত উর্বর মৃত্তিকার উপর নির্ভর করে এদেশে গড়ে উঠেছে কৃষি নির্ভর উন্নয়নশীল দেশের প্রতিশ্রুতি। ফলে বন্যাকে অভিষাপ হিসাবে জনজীবনের জন্যে বিপর্যয়ের কারণ হতে নিস্কৃতি প্রদানের মাধ্যমে সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে বন্যার সুফল গ্রহন করে আমাদের দেশকে একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও উন্নত দেশে পরিনত করার ক্ষেত্রে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহন অত্যন্ত জরুরী। বন্যামুক্ত, বন্যাপীড়িত কিংবা নীতিনির্ধারক সবাইকেই দেশপ্রেমের অনুভূতিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে সত্যিকার ভাবে দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে এবং দেশের উন্নয়নে ভুমিকা রাখতে হবে।