সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি বিদেশি বিনেয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে


sujon প্রকাশিত: ৯:৫৭ অপরাহ্ণ ১ মার্চ , ২০২২
সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি বিদেশি বিনেয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে

আব্দুর রব : চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (যা চট্টগ্রাম ইপিজেড নামে পরিচিত) আমাদের অর্থনীতির অন্যতম শক্তি। দেশের  আটটি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের মধ্যে প্রথম ও প্রধান এই ইপিজেডটি ১৯৮০ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক সংসদে পাশ হওয়া আইনবলে ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ৭০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে সেরা অর্থনৈতিক সম্ভাবনাময় হিসাবে চতুর্থ স্থান অর্জনের গৌরব অর্জন করে এই ইপিজেড।

বিশ্বমানের পরিবেশ ব্যবস্থা বিশেষ করে বর্জ্য নিষ্কাষণ ও এখানকার দূষিত পানি পরিশোধন না থাকার কারণে বিশ্বের উন্নত দেশগুলো এখানে বিনিয়োগ ও ক্রয় আদেশ দিতে অনিহা দেখাতে থাকে। সে পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশ রপ্তানী প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা) চট্টগ্রাম ওয়েস্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট লিমিটেড (সিডব্লিউটিপি) কে নিয়োগ দেয়।

২০০৮ সালে এখানে তারা পরিবেশ ও কর্মিদের স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট (সিইটিপি) বসানোর কাজ শুরু করে। আধুনিক প্রযুক্তি ও বিদেশি মেশিন এনে  দেশে শুরু হয় আন্তর্জাতিক মানের পরিবেশ বাঁচানোর কাজ। ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠানটি আনুষ্ঠানিক সেবা প্রদান শুরু করে। শুরু থেকে মাত্র ৫টি শিল্পকারখানা এ সেবা গ্রহনের তালিকাভুক্ত ছিল। পরে সিডব্লিউটিপির এ কাজের প্রশংসা সবখানে ছড়িয়ে পড়লে সেবার মান ও বিদেশি ক্রেতাদের আগ্রহের কারণে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও এ সেবার আওতাভুক্ত হয়েছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম ইপিজেডের ১৩৯টি শিল্পকারখানা এই সেবা নিচ্ছেন।

চট্টগ্রাম ওয়েস্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট লিমিটেড (সিডব্লিউটিপি) এর প্রধান নির্বাহী (সিইও) মো. আরিফুল হক তালুকদার সম্প্রতি এ বিষয় প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন।

অন্যান্য ব্যবসায় না গিয়ে তিনি এ কাজটি বেছে নিয়েছেন কেন?

আরিফুল হক : মূলত পরিবেশের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং শিল্পকারখানার শ্রমিকসহ দেশের মানুষের সুস্বাস্থ নিশ্চিত করার জন্যই এ উদ্যোগ। দেশে এ জাতীয় প্রকল্প কম থাকা এবং প্রতিষ্ঠান চালানোর দক্ষজনবল না থাকা একটা চ্যালেঞ্জ ছিল, তারপরও দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য এ ঝুঁকিটি নিয়ে কাজটি শুরু হয়।

সবার নিকট থেকে আশানুরুপ সহযোগিতা পাচ্ছেন?

আরিফুল হক : আমি গভীর কৃতজ্ঞতা জানাই বাংলাদেশ রপ্তানী প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা) ও চট্টগ্রাম ইপিজেডকে। এই দুটি প্রতিষ্ঠান আমাদেরকে দারুনভাবে সহযোগিতা করেছেন, এখনও সব ধরণের সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছে। এক কথায় বলা যায়, দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে এই দুটি প্রতিষ্ঠান পরিবেশের গুরুত্ব বুঝে তা রক্ষার জন্য বিশ্বমানের এ উদ্যোগকে এগিয়ে নিচ্ছে।

আপনার প্রতিষ্ঠান মূলত কি জাতীয় কাজ করে?

আরিফুল হক : আমাদের প্রধান কাজ দূষিত পানি শোধন করা। এ প্রকল্পে আমরা ইপিজেডের কারখানাগুলোর দূষিত পানি নির্দিষ্ট খাল থেকে নিয়ে শোধন করে সমুদ্রে ফেলি। পরিবেশ অধিদপ্তরের নীতিমালা অনুযায়ী কারখানার দূষিত পানি ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে ডিওই’র মানদণ্ড অনুযায়ী পানি পরিশোধন করি।

কারখানার দূষিত পানির সঙ্গে সাধারণত ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, সোডিয়াম, পটাসিয়াম ক্যাটেশন এবং কার্বনেট, হাইড্রোজেন কার্বনেট, ক্লোরাইড, সালফেট এবং নাইট্রেট অ্যানিয়ন জাতীয় ক্ষতিকর পদার্থের মিশ্রন থাকে। বিশেষ করে এই ইপিজেডে গার্মেন্টস ও টেক্সটাইলের পাশাপাশি জুতা, গ্লোবস ও ওয়াশিং কারখানা রয়েছে। সেখানকার পানি শোধন করতে বিশ্বমানের প্রযুক্তি ও কেমিকেল ব্যবহার করে থাকি।

এই কাজটি আপনারা কিভাবে করেন? 

আরিফুল হক : আমরা দূষিত পানি নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে প্রাথমিক ভাবে তা ফিল্টার করি। এর পর  এসিড বা অ্যালকালির সঙ্গে নিউট্রালাইজিং করা হয়। এভাবে আরও কয়েকটি পদ্ধতির পর বিশুদ্ধ পানি সাগরে ফেলা হয়।

আপনাদের প্রকল্পের ধারণ ক্ষমতা কত, এখন কতটুকু পরিশোধন করছেন?

আরিফুল হক : সর্বশেষ আমরা যেসব যন্ত্রপাতি স্থাপন করেছি, সেখান থেকে প্রতিদিন ৪৫ হাজার কিউবিক ঘন মিটার পরিশোধন করতে আমরা সক্ষম। বর্তমানে আমরা প্রতিদিন ১৫ হাজার কিউবিক ঘন মিটার পানি পরিশোধন করছি।

আপনাদের পরিশোধনকৃত পানির গুনগত মানের পরীক্ষা হয় কিভাবে?

আরিফুল হক : আমাদের তিনটি স্তর রয়েছে। এখানে ফিজিক্যাল, বায়োকেমিক্যাল এবং কেমিক্যাল। এই তিনটি স্তরেই আধুনিক মেশিনের মাধ্যমে সব সময় পানি শোধনের মাত্রা দেখা যায়। আমরা সিঙ্গাপুরের ইয়ামোটো টেকনোলজি ব্যবহার করি। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) এবং ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) আমাদের কাজের মান পরীক্ষা করে সন্তোষজনক বলে সনদ দিয়েছেন। এর আগে আমরা ম্যানুয়েল সুইচ ব্যবহার করে আসছিলাম, সর্বশেষ অটোমেশন সুইচ স্থাপন করা হয়েছে। একই সঙ্গে বেশ কিছু অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে।

আগামী দিনে এ মান আরও বৃদ্ধির সুযোগ আছে কিনা?

আরিফুল হক : একটি কথা এখানে বলা যায়, বিশ্বজুড়ে পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনে আমাদের এ কাজটিও গুরুত্বপূর্ণ। সে ক্ষেত্রে প্রতিদিনই দূষিত পানি শোধন বা কারখানার বর্জ্য পরিশোধনের আধুনিক পদ্ধতি এবং মেশিন তৈরির গবেষণা চলছে। আমরাও সময়ের সঙ্গে আছি, সবখানে খোঁজ রাখা হচ্ছে। আগামীতে আমরা আরও ভালো সেবা প্রদানের জন্য পাইপ লাইন উন্নত করার কাজ শুরু করেছি।

আপনাদের এ জাতীয় সেবা দেশের আর কোথাও আছে কিনা

আরিফুল হক : দেশের অনেকগুলো ইপিজেডে সিইটিপি চলমান আছে, কোথাও কোথাও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তবে ঢাকা ইপিজেডের প্রায় শতভাগ শিল্পকারখানার বিশাল নেটওয়ার্কের সেবা প্রদান করে আসছে সিঙ্গাপুরের ফ্ল্যাগশিপ কোম্পানি এবং কুমিল্লা ইপিজেডে বাংলাদেশের সিগমা ইঞ্জিনিয়ারিং সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট সেবা দিচ্ছে।

আপনার এ সেবা এখন শুধু চট্টগ্রাম ইপিজেডের মধ্যে আছে, সেখানে কোন সমস্যা আছে কি না?

আরিফুল হক : প্রতিষ্ঠার পর থেকে সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার অভাবে চট্টগ্রাম ইপিজেডে বিদ্যুৎ লাইনের তার, পানি ও গ্যাসের লাইন পরিকল্পিতভাবে বসানো হয়নি। এরপরও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ও চট্টগ্রাম ইপিজেডের সহযোগিতায় আমরা সেখানে পাইপলাইন বসাতে সক্ষম হয়েছি। এখন আরও উন্নত পাইপলাইন বসানোর কাজ চলছে। আশা করছি, দ্রুত এ কাজ সম্পন্ন হবে। পাইপ লাইন নেটওয়ার্ক তৈরির এ কাজটি করতে গিয়ে কিছু সমস্যায় পড়তে হয়েছে, তবে তা সবার সহযোগিতায় ভালোভাবে সম্পন্ন হচ্ছে।

এ কাজের জন্য কী ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছেন?

আরিফুল হক : আসলে এখানে সবার সহযোগিতা রয়েছে। বিশেষ করে একটি কারখানার উন্নত পরিবেশ নিশ্চিত না হলে তারাও বিদেশি ক্রেতা থেকে বঞ্চিত হন আবার দেশও অর্থনীতির শক্ত বলয় থেকে পিছিয়ে যায়। তবে বৈশ্বিক সব কিছুর মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সবখানেই রয়েছে। আমাদের প্রয়োজনীয় অধিকাংশ কেমিক্যালই বিদেশ থেকে আমদানী করতে হয়, সেগুলোর দাম বেড়ে গেলে কিছুটার সমস্যা দেখা যায়। তবে আলোচনা সাপেক্ষ সে সময় কর্তৃপক্ষ আমাদের ইফ্লুয়েন্টের দাম বাড়ালে এ কাজটি সহজভাবে চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়।

চট্টগ্রাম ইপিজেডের কতগুলো কারখানা আপনাদের এ সেবা নিচ্ছে?

আরিফুল হক : বলা যায়, প্রায় ৯০ ভাগ শিল্প প্রতিষ্ঠান আমাদের সেবার আওতাভুক্ত রয়েছে। আশা করছি, কিছু দিনের মধ্যেই বাকি ১০ ভাগ এ সেবা গ্রহন করবে।

আগামী দিনের কী পরিকল্পনা?

আরিফুল হক : আমরা শুরুতেই বলেছি, দেশের সমৃদ্ধ অর্থনীতির পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষা করা একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। এখন বিশ্বজুড়ে উৎপাদনের সঙ্গে শ্রমিকের জীবন-মান এবং কারখানার পরিবেশ সবার আগে দেখা হয়। সব কিছু পরিবেশ বান্ধব না হলে বিদেশিরা সেখানে বিনিয়োগ বা ক্রেতা হিসেবে থাকতে চান না। সব মিলে এটা এখন আমরাও বুঝছি, আমাদের আগামী প্রজন্মের বাসযোগ্য দেশ গড়তে সবার আগে সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। পরিবেশ বান্ধব শিল্পকারখানা গড়তে এ কাজের বিকল্প নেই। এখন সরকার সুযোগ দিলে আমাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা দিয়ে আমরা অন্যান্য অর্থনৈতিক অঞ্চলেও এ সেবা প্রদান করতে পারব।